গরুকে বাছুর দেখিয়ে বিএসএফের ঘুষ বাণিজ্য!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৪০

কাগজে কলমে গরুকে বাছুর বানিয়ে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও কেন্দ্রীয় শুল্ক দপ্তরের (কাস্টমস) কর্মকর্তারা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে গবাদি পশু পাচারের তদন্তে নেমে এমনটাই জানতে পেরেছে দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই।

পাচারের এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিএসএফ, কাস্টমসসহ বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক সরকারি কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে গরু পাচার নিয়ে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। ওই এফআইআরে মূল অভিযুক্তদের অন্যতম সতীশ কুমার। বিএসএফের কমান্ডান্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তা তিনি।

সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সারের এপ্রিল সতীশ কুমার পশ্চিমবঙ্গে বিএসএফের ৩৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডান্ট ছিলেন। ওই ১৬ মাসে তার বাহিনী মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় বাংলাদেশ সীমান্তে বাজেয়াপ্ত করেছিল প্রায় ২০ হাজার গরু। কিন্তু বাজেয়াপ্ত করা সেই গরুকেই বিএসএফের সরকারি নথিতে করা হচ্ছিল বাছুর। এর পর গরুর যা দাম, তার অনেক কম দামে সেই ‘বাছুর’ নিলাম হত স্থানীয় বাজারে। আর নিলামে সেই গরু ফের কম দামে কিনে নিত মুর্শিদাবাদের কুখ্যাত পাচারকারীরা।

বিশু শেখ সেই চক্রের মাথা। নিলামে কিনে নেওয়া ওই গরুই ফের সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যেত বাংলাদেশে। আর বিএসএফ যে গরুকে ‘বাছুর’ বানিয়ে দিল, তার ‘মূল্য’ দিত বিশু শেখের সিন্ডিকেট। বিএসএফের জন্য বরাদ্দ থাকত গরু প্রতি ২ হাজার টাকা। আর ৫০০ টাকা কাস্টমসের জন্য।

মঙ্গলবার সিবিআইয়ের কলকাতার ডিআইজি অখিলেশ কুমার সিংহ একটি এফআইআর (আরসি ১০২০২০এ০০১৯) দায়ের করেন। সিবিআইয়ের করা ওই এফআইআরে অভিযুক্ত করা হয়েছে সতীশ কুমারকে। সিবিআইয়ের দুর্নীতি দমন শাখার করা এফআইআরে সতীশ একা নন, তার ছেলে, গরু পাচার চক্রের মাথা বিশু শেখ ওরফে মুর্শিদাবাদের ডাকসাইটে ব্যবসায়ী এনামুল হক, তার সঙ্গী আনারুল শেখ ও গোলাম মোস্তাফাসহ অজ্ঞাত পরিচয়ের একাধিক সরকারি কর্মী এবং অন্যদের নাম রয়েছে।

সিবিআইয়ের অভিযোগ, গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে সতীশ নিজে তো লাভবান হয়েছেন, সেই সঙ্গে আর্থিক মুনাফা পেয়েছেন তার ছেলে ভুবন ভাস্করও। সিবিআইয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, সতীশের ছেলে ভুবন ভাস্কর এনামুলের কোম্পানি ‘মেসার্স হক ইন্ডাস্ট্রি’তে চাকরি করেছেন বেশ কিছু দিন। সেখান থেকে তিনি মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতনও পেতেন। তদন্তকারীদের দাবি, এটাও ঘুরিয়ে গরু পাচারে সুবিধা করে দেওয়া বাবদ বেআইনি রোজগার।

গরু পাচারচক্রের হদিশ পেতে বুধবার কলকাতা, সল্টলেক, রাজারহাট, মালদহ, মুর্শিদাবাদসহ ১৩টি জায়গায় তল্লাশি করে সিবিআই। রাজ্যের বাইরে অমৃতসর, গাজিয়াবাদ এবং রায়পুরে তল্লাশি চালান সিবিআইয়ের কর্মকর্তারা। সতীশের সল্টেকের বাড়িতে তল্লাশি চলে। পরে এদিন সন্ধ্যায় ওই বাড়ি সিল করে দিয়েছে সিবিআই। সতীশ বর্তমানে ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে কর্মরত। সেখানেও তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা। সিবিআই হানা দেয় তার গাজিয়াবাদের বাড়িতেও। এছাড়া মুর্শিদাবাদের কুলগাছিয়াতে অভিযুক্ত এনামুলের গ্রামে তার সিন্ডিকেটের দুই সদস্য গোলাম মোস্তাফা এবং আনারুল শেখের বাড়িতেও তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা।

৩৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর মালদহে হলেও, তার আওতায় থাকা চারটি কোম্পানির পাহারার দায়িত্ব ছিল মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের আন্তর্জাতিক নদী সীমান্তের একটা বড় অংশে। সিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, 'এ রাজ্যে কর্মরত বিএসএফের অন্য এক কমান্ডান্ট জিবু ডি ম্যাথিউকে ২০১৮ সালে বিপুল অঙ্কের হিসাব বহির্ভূত টাকাপয়সাসহ পাকড়াও করা হয়। সেই তদন্তেই উঠে আসে, ওই বিপুল অঙ্কের টাকা তিনি ঘুষ হিসাবে পেয়েছিলেন গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। জিবুকে জেরা করেই সেই সময় গ্রেফতার করা হয় মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী এনামুল হককে। জানা যায়, এনামুলই গরু পাচার সিন্ডিকেটের মাথা। বিশু শেখ নামে সেই সিন্ডিকেট চালান এনামুল।'

এনামুল ওই মামলায় পরে জামিন পান। কিন্তু জিবু এবং তার বয়ানে উঠে আসে সতীশ কুমারের নাম। জানা যায়, ওই গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে জিবুর মতো মোটা টাকা ‘ঘুষ’ নিয়েছেন সতীশও। কীভাবে বেআইনি লেনদেন হয়েছে, তা জানতে ২০১৮ সালের সতীশের বিরুদ্ধে একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে সিবিআই। সিবিআই সূত্রে খবর, প্রাথমিক ওই অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিএসএফের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে হাজার হাজার গরু পাচার করেছে বিশুর সিন্ডিকেট। মোটা টাকার বিনিময়ে সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে গরু পাচার করতে।

শুধু পাচারে সহায়তা নয়, বাজেয়াপ্ত গরুকে খাতাকলমে বাছুর হিসাবে দেখিয়েও সরকারকে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সিবিআইয়ের। সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে পাচারকারীদের। সিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, 'পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাঁত করেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিছু কিছু গবাদি পশু বাজেয়াপ্ত করা হত। সেই সংখ্যাটাই সতীশের এলাকায় ১৬ মাসে প্রায় ২০ হাজার।'

তার ব্যাখ্যা, আসলে গরু বাজেয়াপ্ত করে বিএসএফ কর্মকর্তারা প্রমাণ করতেন, তারা সীমান্ত প্রহরায় কতটা সতর্ক। কিন্তু সেই ফাঁকেই চলত কোটি কোটি টাকার প্রতারণা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'একটি পূর্ণবয়স্ক গরুর দাম যদি নিলামে ৬০ হাজার টাকা হয়, তবে বাছুরের দাম তার প্রায় অর্ধেক। খাতাকলমে বাজেয়াপ্ত গরুকে বাছুর দেখিয়ে নিলামের সময় দাম কমানোর ব্যবস্থাটা করে দিতেন বিএসএফ আধিকারিকদের একাংশ। কম দামে সেই গরু কিনে ফের পাচার করা হত। আর সেটা করত এনামুলের সিন্ডিকেট।'

প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিবিআই জানতে পেরেছে, ওই সময় কালে প্রায় ২০ হাজার গরু ধরা পড়লেও একবারও কোনো গাড়ি বা কোনো পাচারকারী ধরা পড়েনি। সিবিআই তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, গাড়ি বাজেয়াপ্ত করলে সেই গাড়ির মালিক কে, কোথা থেকে গরু বোঝাই করা হয়েছে— এ ধরনের প্রশ্ন ওঠে। পাচারকারীদের সঙ্গে আঁতাঁতের জন্যই সেই সূত্র কোথাও রেখে দেননি কাস্টমস বা বিএসএফ কর্মকর্তাদের ওই অংশ।

সিবিআইয়ের অভিযোগ, এভাবে সরকারের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা করেছেন কাস্টমস এবং বিএসএফ কর্মকর্তাদের একাংশ। দুর্নীতি দমন শাখার ৭, ১১ এবং ১২ নম্বর ধারায় ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সিবিআই। যোগ করা হয়েছে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০ বি ধারাও। আনা হয়েছে ষড়যন্ত্রের অভিযোগও।

সিবিআই কর্মকর্তাদের ইঙ্গিত, বিএসএফ এবং কাস্টমসের পাশাপাশি, এ রাজ্যের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরও নাম উঠে এসেছে প্রাথমিক অনুসন্ধানে। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বিএসএফ এবং কাস্টমসের কর্মকর্তাদের মতোই লাভবান হয়েছেন গরু পাচারের সিন্ডিকেট থেকে। তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, এই মামলায় ফের এনামুলকে হেফাজতে নেওয়া হতে পারে। সতীশ কুমারকেও প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিতে পারে সিবিআই। সূত্র: আনন্দবাজার

ঢাকা টাইমস/২৪সেপ্টেম্বর/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :