কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব বনাম বাংলাদেশের শ্রমবাজার

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান
  প্রকাশিত : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:০১
অ- অ+

এগিয়ে আসছে সেই অদৃশ্য দানব, যার আগমনের কথা কার্ল মার্ক্স থেকে শুরু করে আধুনিক অর্থনীতিবিদরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আজ কোনো কামানের গর্জন ছাড়াই 'অটোমেশন'-এর মোড়কে আমাদের রুটি-রুজি গ্রাস করতে আসছে এক যান্ত্রিক মহাবিপর্যয়!

যে হাতগুলো একদা সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছিল, কিংবা কিবোর্ডের বোতামে ফ্রিল্যান্সিংয়ের স্বপ্ন বুনতআন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) প্রতিবেদন অনুযায়ী 'সিউ-বট' (Sew-bot) আর 'জেনারেটিভ এআই'-এর করাল গ্রাসে সেই হাতগুলো আজ কতটা বিপন্ন হতে চলেছে?

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রে এবং অসবোর্ন যে 'টেকনোলজিক্যাল আনএমপ্লয়মেন্ট' বা প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যেখানে ৪৭ শতাংশ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে, তা আজ আর কোনো তাত্ত্বিক ভীতি নয়, তা আমাদের দরজায় কড়া নাড়া এক রূঢ় বাস্তবতা।

আগস্টের রক্তস্নাত ভোরে আমরা যে সার্বভৌমত্বের শপথ নিয়েছিলাম, হায়! সেই সার্বভৌমত্ব আজ সিলিকন ভ্যালির 'ডেটা কলোনিয়ালিজম' বা তথ্য-ঔপনিবেশিকতার গোলকধাঁধায় বন্দি হতে চলেছে। জোসেফ শুমপিটার যাকে বলেছিলেন 'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন' বা সৃজনশীল ধ্বংস, তা আজ আমাদের জন্য কেবলই ধ্বংস হয়ে আসছে।

এআই কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি ডেভিড অটরের বর্ণিত 'শ্রমবাজারের মেরুকরণ' (Labor Market Polarization)-এর এক নীরব সুনামি। যদি আমরা নিজেদের 'রিস্কিলিং' বা দক্ষতা পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই স্রোতের বিপরীতে না দাঁড়াই, তবে আগামীর বাংলাদেশ হবে 'স্ট্রাকচারাল আনএমপ্লয়মেন্ট'- ধুঁকতে থাকা কোটি কোটি কর্মহীন মানুষের হাহাকার আর ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পের এক বিশাল গোরস্থান!

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর হাত ধরে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের স্বর্ণদ্বারে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশের প্রস্তুতি তখন কোথায় অবস্থান করছে? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং এটুআই (a2i)-এর সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, সার্বিক প্রস্তুতি না থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৫৪. লক্ষ কর্মসংস্থান এআই অটোমেশনের কারণে সরাসরি উচ্চ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই ডাটা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, আমরা যদি আজই আমাদের দক্ষতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন না করি, তবে আগামী দুই দশকে আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং এক বিশাল বেকারত্ব সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। এআই কেবল সুবিধা আনেনি, এটি আমাদের প্রথাগত অদক্ষ জনশক্তির জন্য এক মরণঘণ্টা বাজাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাক শিল্প আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। যেখানে একসময় হাজারো মানুষের হাতের ছোঁয়ায় একটি পোশাক তৈরি হতো, সেখানে আজ রোবটিক আর্ম সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে। বিশেষ করে সোয়েটার ওভেন কারখানায় উৎপাদন লাইনে কর্মী সংখ্যা যথাক্রমে ৩৭. শতাংশ ২৭. শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি আমাদের নির্দেশ করে যে, আমাদের শিল্পের চিরাচরিত শ্রম-নির্ভর মডেলটি এখন এআই-এর কাছে সেকেলে হয়ে গেছে এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তর না ঘটলে আমরা বিশ্ববাজার থেকে ছিটকে পড়ব। এর ফলে নারী শ্রমিকরা, যারা এই খাতের চালিকাশক্তি, তারা সামাজিক অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

সংস্করণ : হাহাকার সতর্কবার্তা (গভীর আবেগপ্রবণ): "আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদার যে গর্বিত সৌধটিফ্রিল্যান্সিংআউটসোর্সিং’-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, আজ তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআই-এর নির্মম মরণকামড়ে ক্ষতবিক্ষত বিপন্ন। বাজারের সাম্প্রতিক এক নির্মম বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়ানক চিত্রচ্যাটজিপিটি (ChatGPT) আর মিডজার্নির (Midjourney) মতো যান্ত্রিক দানবের আগ্রাসনে কনটেন্ট রাইটিং, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন আর অনুবাদের মতো সৃজনশীল প্রান্তর আজ বিরাণভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। কাজের অর্ডারের পতনের এই হার ৫২.% থেকে ৬৪.%— কেবল নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়, হলো আমাদের তরুণদের স্বপ্নভঙ্গের এক করুণ দলিল। যে সাধারণ দক্ষতার ওপর ভর করে তারা এতদিন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখত, সেই আকাশ আজ অ্যালগরিদমের কালো মেঘে ঢাকা।

তথ্যের কশাঘাতে দেখা যায়, গত ১৮ মাসে যে পকেটে ,২০০ ডলারের সচ্ছলতা ছিল, আজ সেখানে ৮৫০ ডলারের দীনতা উঁকি দিচ্ছে। এই পতন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এক রূঢ় বাস্তবতাযদি আমরা আজই উচ্চতর এআই দক্ষতা আর প্রকৃত সৃজনশীলতার বর্মে নিজেদের সজ্জিত না করি, তবে আমাদের এই সম্ভাবনাময় ফ্রিল্যান্সিং খাতটি অচিরেই এক মেধাবী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।"

সংস্করণ : বাজার বিশ্লেষণের কঠিন সত্য বলছেচ্যাটজিপিটি মিডজার্নির আগমনে আমাদের কন্টেন্ট, ডিজাইন আর অনুবাদের চিরাচরিত বাজার ধসে পড়েছে। ৫২.% থেকে ৬৪.% পর্যন্ত কাজের এই জ্যামিতিক পতন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি অশনিসংকেত যে, বিশ্ববাজার এখন আর মানুষের সাধারণ শ্রমে তুষ্ট নয়, তা এখন এআই-এর দখলে। উপার্জনের গ্রাফে যে ধস নেমেছে, তা কি আমাদের বিচলিত করে না? এই সংখ্যাগুলো বলছে: সাধারণ দক্ষতার দিন শেষ। আজ যদি আমরা নিজেদের মেধা মননকে এআই-এর সমকক্ষ না করি, তবে এই বিপুল সম্ভাবনার খাতটি অচিরেই পরিণত হবে এক ব্যর্থ মেধাবী ধ্বংসস্তূপে।"

সংস্করণ : সাহিত্যিক দার্শনিক (গাম্ভীর্যপূর্ণ): চ্যাটজিপিটি আর মিডজার্নির মতো প্রযুক্তির উৎকর্ষ আজ আমাদের ফ্রিল্যান্সিংআউটসোর্সিং’-এর অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত হেনেছে। সাম্প্রতিক বাজার সমীক্ষা যেন এক শোকগাথাযেখানে কন্টেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন আর অনুবাদের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন কাজের প্রবাহ কমে গেছে। এ কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, হলো আমাদের সক্ষমতার ওপর এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এই নির্মম সত্য মেনে নিতেই হবে যে, উচ্চতর এআই দক্ষতা মানবিক সৃজনশীলতার মেলবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত খুব শিগগির বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

এআই-এর কুপ্রভাব আমাদের শিক্ষা সৃজনশীলতার ওপরও এক গভীর কালো ছায়া ফেলেছে। ইউনেস্কোর (UNESCO) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭১.% এখন তাদের মৌলিক অ্যাসাইনমেন্ট গবেষণার জন্য শতভাগ জেনারেটিভ এআই-এর ওপর নির্ভরশীল। এই ডাটা আমাদের নির্দেশ করে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেক্রিটিক্যাল থিংকিংবা স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা প্রায় ৪৫.% হ্রাস পেয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, আমরা এমন এক শিক্ষিত সমাজ তৈরি করছি যারা কেবল প্রম্পট (Prompt) দিতে জানে, কিন্তু কোনো সমস্যার গভীরে যাওয়ার ধৈর্য বা মেধা রাখে না।

তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশীয় সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কোডিং এর প্রায় ৬২% এআই দিয়ে করা হচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে আমাদের নবীন ইঞ্জিনিয়ারদের লজিক গড়ার ক্ষমতা স্থবির হয়ে পড়ছে।

ভবিষ্যতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে আমাদের সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশে এআই-চালিত জালিয়াতির হার গত বছরের তুলনায় ৪৮.% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ডাটা আমাদের নির্দেশ করে যে, আমাদের সাধারণ মানুষ আজ এক অদৃশ্য ডিজিটাল দস্যুতার শিকার। বিশেষ করেডিপফেকভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা বেড়েছে ৫৬.%, যা নির্দেশ করে যে এআই আমাদের সামাজিক ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে পুরোপুরি অরক্ষিত করে তুলেছে। এছাড়া এআই-চালিত ফিশিং অ্যাটাকের মাধ্যমে আর্থিক জালিয়াতি বেড়েছে ৩৯.%, যা নির্দেশ করে যে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এআই ছড়িয়ে পড়ে, তবে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো দ্রুত 'রিস্কিলিং' বা দক্ষতার পুনর্বিন্যাস। পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশ তাদের কারিকুলামে এআই-কেসৃজনশীল হাতিয়ারহিসেবে যুক্ত করেছে, তাদের জাতীয় উৎপাদনশীলতা ৩২.% বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আমাদের নির্দেশ করে যে, আমাদের এআই-এর বিরুদ্ধে নয়, বরং এআই-কে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

তথ্য বলছে, অটোমেশনের সাথে কাজ করার প্রশিক্ষণ নিলে একজন শ্রমিকের চাকরি টিকে থাকার সম্ভাবনা ৬৮.% বৃদ্ধি পায়। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে এখনই জাতীয় এআই নীতিমালা এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন ছাড়া আমাদের রক্ষা নেই। যদি আমরা বছরে অন্তত লক্ষ মানুষকে উচ্চতর প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তবেই আমরা এই সুনামি মোকাবিলা করতে পারব।

পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবেআমরা কি এআই-এর দাসে পরিণত হব, না কি এর নিয়ন্ত্রক হব? এআই-এর এই কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে হলে আমাদের শিক্ষার মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রযুক্তির সাথে দেশপ্রেমের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। এআই-এর কোনো আত্মা নেই, কিন্তু আমাদের আছে। সেই আত্মার টান আর মেধার জোরেই আমরা এই ডিজিটাল অন্ধকার পাড়ি দেব।

লেখকদ্বয়:

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপে গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর।

দাউদ ইব্রাহিম হাসান: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এবং ব্র্যাক বিশ্বদ্যিালয়ের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
সুস্থ ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই: উপদেষ্টা তিতুমীর
শিশু রামিসা হত্যা: সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ
বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, তিন কমিশনারও নিয়োগ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা