পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে ইকোজেন

লোডশেডিং, জ্বালানির উচ্চমূল্য, বিদ্যুতের অপচয় এবং পরিবেশ দূষণ- বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এর সঠিক সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এই বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ইকোজেন সলিউশন লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, প্রচলিত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে আধুনিক, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী লিথিয়াম প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা।
বাংলাদেশের শিল্প-কারখানা, ইজিবাইক, টেলিকম টাওয়ার, কৃষি খামার, মৎস্য খামার এবং সাধারণ পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি। তবে এই প্রযুক্তির রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা।
কম আয়ুষ্কাল, চার্জিংয়ে বেশি সময়, বিদ্যুতের অপচয় এবং ব্যবহারের পর ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি হওয়ায় আধুনিক জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে এই প্রযুক্তি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছে ইকোজেন।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গাতেই লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে ইকোজেন ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি লিথিয়াম-আয়ন ইভি ব্যাটারি এবং এক হাজারের বেশি হোম আইপিএস সলিউশন সরবরাহ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি বর্তমানে ইজিবাইক, মুরগির খামার, মৎস্য খামার এবং হোম এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থায় ব্যবহার হচ্ছে।
ইকোজেন জানায়, তাদের ব্যাটারিতে ব্যবহৃত LiFePO₄ (Lithium Iron Phosphate) প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং উচ্চ কার্যক্ষমতার জন্য পরিচিত। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য অধিক নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করে।
ইকোজেনের দাবি, তাদের ব্যাটারি ব্যবস্থায় এআই-ভিত্তিক মনিটরিং এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা ব্যাটারির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এই প্রযুক্তি ব্যাটারির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নতমানের সেবা দিতে সহায়তা করছে।
ইকোজেনের কর্মকর্তারা জানান, লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় লিথিয়াম প্রযুক্তি দ্রুত চার্জ হয়, বিদ্যুতের অপচয় কমায় এবং দীর্ঘ সময় কার্যক্ষম থাকে।
তাদের দাবি, একটি লিথিয়াম ব্যাটারি যেখানে ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, সেখানে একই সময়ের মধ্যে একাধিক লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে ব্যবহারকারীর খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশে ব্যাটারি বর্জ্যের চাপও কমে।
দেশেই আন্তর্জাতিক মানের লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইকোজেন। প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে দেশের বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
সরকারের আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ইকোজেন। তাদের মতে, এ ধরনের নীতিগত সহায়তা দেশে আধুনিক জ্বালানি প্রযুক্তির বিকাশকে আরও গতিশীল করবে।
বাংলাদেশের প্রথম লিথিয়াম প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মাসুদ কবির বলেন, লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় লিথিয়াম প্রযুক্তি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘস্থায়ী।
তিনি বলেন, যেখানে একাধিক লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, সেখানে একটি লিথিয়াম ব্যাটারি দীর্ঘ সময় সেবা দিতে পারে। ফলে ব্যাটারি বর্জ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কম তৈরি হয়।
ইকোজেন সলিউশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাসুদ রানা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যাটারি বিক্রি করা নয়; বরং বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিরাপদ, টেকসই এবং আন্তর্জাতিক মানের এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। আমরা চাই বাংলাদেশ শুধু লিথিয়াম ব্যাটারির ব্যবহারকারী নয়, ভবিষ্যতে উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করুক।”
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি প্রযুক্তিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও আধুনিক লিথিয়াম প্রযুক্তির বিস্তার জ্বালানি খাতের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে ইকোজেন।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, লিথিয়াম প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের অপচয় কমবে, পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস পাবে এবং দেশের টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, স্থানীয় উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন পরিবর্তন আনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইকোজেন।
(ঢাকাটাইমস/২৫ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































