বহু পরিচয়ে বহু প্রেম, শেষ প্রেমিকায় ধরা

আল-আমিন রাজু, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৯:১০ | প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৯:০৮

ইয়াসিন ওরফে রাতুল। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে রাতুল বড়। পড়াশোনা করেছেন নবম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপরই ঢাকায় চলে আসেন। বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো কাজ করলেও টাকার লোভে এক পর্যায়ে প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন। অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে অনলাইনে বিভিন্ন তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন রাতুল। নানাভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে তরুণীদের আসক্ত করতেন তিনি। কখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কখনো একটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী, কখনো সিনেমার ডান্স ডিরেক্টর পরিচয় দিতেন। এছাড়াও প্রেমের ক্ষেত্রে তরুণীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য নিজেকে গরিব, বাবা-মায়ের ত্যাজ্য সন্তান, এমনকি ধার্মিক পরিচয়ও বাদ রাখেননি এই প্রতারক।

প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার এক তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে গত মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) রাতুলকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাকে ধরতে অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইন্টেলিজেন্ট শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ।

রাতুলের এমন অভিনব প্রতারণা সম্পর্কে এই কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রাতুলকে গ্রেপ্তারের পর বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছি। তাকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখে দুজন ভুক্তভোগী আমাদের কাছে এসেছিল। তারাও রাতুলের কাছে একই ধরনের প্রতারণার শিকার।’

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকেও একইভাবে মোবাইল চুরি করে নিয়ে আসেন রাতুল। একজন ভুক্তভোগী সিআইডিকে জানিয়েছেন, প্রতারক রাতুলের সঙ্গে মিরপুর ১ নম্বরের একটি রেস্টুরেন্টে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ওই দিনই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ ছিল। তখন প্রতারক রাতুল ওই তরুণীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি খুবই স্মার্ট ও আধুনিক। দেশের নামকরা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। পাশাপাশি ওই তরুণীকে রাতুল জানান, তিনি একজন কারাতে মাস্টার এবং সিনেমার ড্যান্স ডিরেক্টর। এছাড়া মিডিয়ায় তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। প্রতারক অ্যাপসভিত্তিক রাইডার ব্যবহার করে মিরপুর গেলেও ওই তরুণীকে জানান, তার বন্ধুর গাড়িতে করে এসেছেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে প্রতারক রাতুল ওই তরুণীকে জানান, তার একটি জরুরি কল করতে হবে, কিন্তু তার নিজের ফোনে ব্যালেন্স নেই। পরে কল দেয়ার নাম করে মোবাইল নিয়ে সটকে পড়েন রাতুল।

রাতুল সম্পর্কে সিআইডির এই পুলিশ সুপার বলেন, ‘রাতুল চলন-বলনে স্মার্টনেস প্রকাশ করলেও এটি আসলে মেকি বা বানানো স্মার্টনেস। প্রতারণায় পিএইচডি অর্জন করলেও রাতুলের শিক্ষাগত যোগ্যতা নবম শ্রেণি। সে একসঙ্গে অনেক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেত। বিভিন্ন সময়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করতো আবার কখনো কখনো একটি সরকারি কলেজের নাম ব্যবহার করতো। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রকাশের জন্য কথায় কথায় ইংরেজি ব্যবহার করতো। বর্তমান সময়ের তরুণীরা একজন তরুণের মধ্যে যেসব গুণাগুণ এবং দক্ষতা পছন্দ করে প্রতারক রাতুল এর সবগুলোই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতো।’

সিআইডি জানায়, রাতুলের মূল টার্গেট ছিল যেসব তরুণী মিডিয়ার দিকে আগ্রহী এবং যারা আড্ডা-ঘোরাফেরায় বেশি অভ্যস্ত তাদেরকে প্রতারণার জালে ফেলা। তিনি নিজেকে গরিব ঘরের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতেন। এমনকি মেয়েদের কাছে সহানুভূতি পাওয়ার জন্য অনেক সময় নিজেকে বাবা-মায়ের ত্যাজ্যপুত্র হিসেবেও পরিচয় দেন। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি জাল দলিলও দেখান। এমনকি নিজেকে ধার্মিক পরিচয় দিয়ে বিশ্বস্ততা অর্জনের চেষ্টা করতেন রাতুল। সিআইডির অভিযানে গ্রেপ্তারের সময় রাতুলের হাতে তসবিহ পাওয়া গেছে। তিনি নিজেকে নামাজি পরিচয় দিতেন। অনেক মেয়েকে বলতেন, আমি নামাজ শেষ করে এসে কল দিচ্ছি। যা ছিল তার প্রতারণার একটি কৌশল মাত্র। রাতুলের অভিনব কৌশলের কাছে মেয়েরা খুব সহজেই হার মেনে যেত। ফলে অল্পতেই রাতুল তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতেন। আর তার কাজ শেষ হওয়ার পরেই আসল রূপের প্রকাশ ঘটাতেন। আপত্তিকর ভিডিও এবং ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতিয়ে নিতেন। বিভিন্ন সময়ে মোটা অংকের টাকা চেয়ে তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করতেন।

সিআইডির কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রতারক ইয়াসিন রাতুলকে গ্রেপ্তারের সময় জব্দ করা মোবাইলে আটজন তরুণীর তথ্য পাওয়া গেছে। এই তরুণীদের সঙ্গে তার বিভিন্ন ধরনের ভিডিও কন্টেন্ট পাওয়া গেছে। এগুলো সে বিভিন্ন সময় রেকর্ড করে রেখেছে। একটি মেয়ের সঙ্গে হোটেলে থাকার ভিডিও এবং আমাদের এই মামলার বাদীর সঙ্গে লঞ্চে ভ্রমণের সময়ের আপত্তিকর ভিডিও পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাতুল প্রতারণার বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি প্রেমিক সেজে পাঁচ তরুণীর কাছ থেকে মোবাইল চুরির কথা স্বীকার করেছে।’

পুলিশের বিশেষ শাখার এই কর্মকর্তা দেশের উঠতি বয়সি তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, ‘স্মার্ট আধুনিক তরুণ দেখলেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে যাবেন না। একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আগে তার সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে নেবেন। অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। এত সহজলভ্য হওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি আমি অভিভাবকদের বলবো, আপনাদের সতর্ক হতে হবে এবং আপনার সন্তানকেও সতর্ক করে দেবেন।’

বর্তমানে রাতুল সাইবার ক্রাইমের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে কারাগারে আছেন। আগামী সোমবার আদালতে রাতুলের রিমান্ড শুনানি হবে। তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

(ঢাকাটাইমস/১৯নভেম্বর/এআর/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :