মিডল্যান্ড ব্যাংকের এমডির দুর্নীতির তদন্ত কবে শেষ করবে দুদক?

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১০ মে ২০২১, ১৬:১৯

সরকারের বিশেষ বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা নতুন নয়। নামে-বেনামে অর্থছাড়ের ঘটনায় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তার নামই এসছে। ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জসসহ এক ডজনেরে বেশি অভিযোগে মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আহসান উজ জামানের বিরুদ্ধে পাঁচ বছর আগে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।

দুদকের করা সেসব অনুসন্ধানে বলা হয়, এই ব্যাংক ব্যবস্থাপক মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ৭১টি অ্যাকাউন্টে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা নিজ ক্ষমতার ব্যবহার করে অবৈধভাবে লেনদেন করেছেন। এসব লেনদেনের পক্ষে কোনো ধরণের বৈধতা নেই বলেও দুদকের তদন্তে উঠে আসে। একই সঙ্গে এসব লেনদেনে চরম অসঙ্গতি পায় সংস্থাটি।

এই ঘটনায় ২০১৫ সালে মিডল্যান্ড ব্যাংকের এমডি ও তার স্ত্রী মিসেস আনিসা জামানের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় তথ্য চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিআইএফইউ) মহাব্যবস্থাপক বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়।

ওই বছরের দুদকের উপ পরিচালক এসএম রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে আহসান উজ জামানের কাছে তার ব্যাংক হিসাবসহ যাবতীয় সম্পদের রেকর্ডপত্র পেশ করতে বলা হয় দুদকের দেওয়া দুই দফা নোটিশেও সম্পদের বিবরনীসহ রেকর্ডপত্র দিতে পারেনি তিনি। পরে তিনি দুদকের কাছে আরও তিন মাসের সময় চেয়ে আবেদ করেন।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর এক চিঠির মাধ্যমে মিডল্যান্ডের এই এমডিকে একই মাসের ২০ তারিখের মধ্যে দুদক প্রধান কার্যালয়ে এসে বক্তব্য প্রদান করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাবসহ চাকরি বৃত্তান্তসহ আরও কিছু আনুসাঙ্গিক বিষয়ের তথ্য চওয়া হয়।

এই তলবী নোটিশের প্রেক্ষিতে দুদকের বেধে দেওয়া সময়ের তিন দিন আগেই অর্থাৎ ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দুদক প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন আহসান উজ জামান। সেদিন বেলা সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংস্থাটির তদন্ত কর্মকর্তা।

দুদকের সেই তলবী নোটিশে বলা হয়, আপনাকে (আহসান উজ জামান) মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১০টি হিসাবের মাধ্যমে ৬৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক তলব করেছে।

তবে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার বরাতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে খোলা তার ৭১টি অ্যাকাউন্ট নাম্বারে অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন খবর জানানো হয়। জানা যায়, এই ব্যাংক হিসবাগুলোতে সর্বমোট মোট ১৫ কোটি ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার ৩১ টাকা লেনদেন করেন আহসান উজ জামান।

এর মধ্যে ২৬টি হিসাবে ২০১০ সালের ৩০ জুন ৭ কোটি ২৯ লাখ ২৫ হাজার ২২৯ টাকা জমা হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স এর পলিসি নং বিডি-২৩৬৫২-এ ১ কোটি ৪২ লাখ ৪০০ টাকা জামার তথ্য পাওয়া যায়। দুদক এই বিপুল অর্থেও উৎস ও অবস্থান জানতে চায় তার কছে।

একইভাবে বাকি ৪৫টি হিসাব নাম্বারে জমা হওয়া ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের ৭ জুন পর্যন্ত জমা হওয়া মোট ৮ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮০২ টাকার জমা ও খরচসহ এই টাকার উৎসহ এবং বিস্তারিত বিবরণ সেই সঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সময়ে এই বিপুল টাকা কোথায় কিভাবে গেছে এরও ব্যাখ্যা চায় দুদক।

আহসান উজ জামানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

অবৈধভাবে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আহসান উজ-জামানের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে দুদকের উপপরিচালক এস এম রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

এ মামলার বিষয়টি তখন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন দুদকের সাবেক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল। ওই সময় সংস্থাটির তৎকালীন সচিব জানান, এই মামলায় আহসান উজ-জামানের বিরুদ্ধে ১ কোটি ১২ লাখ ২৮ হাজার টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর মামলার এজাহারে বলা হয়, মিডল্যান্ড ব্যাংকের এমডি আহসান উজ-জামান, তার স্ত্রী সোহেলী বেগম ও মা আনিসা জামানের একক ও যৌথ মোট ২৫টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। অথচ তিনি তার আয়কর নথিতে মাত্র চারটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য উল্লেখ করেছেন।

ওই ২৫টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৭ কোটি ২৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা থাকার নথিগত প্রমাণ পায় দুদক। কিন্তু আয়কর নথি ও দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি ৬ কোটি ১৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা থাকার কথা উল্লেখ করেন। বাকি ১ কোটি ১২ লাখ ২৮ হাজার ৫৪২ টাকা অবৈধভাবে অর্জন করা হয়েছে বলে এজাহারে বলা হয়।

এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা দুদকের অনুসন্ধান উঠে এলেও এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংস্থাটি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর আহসান উজ জামানের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলাটিরও পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়েছে।

এ মামলার অগ্রগতির বিষয়ে দুদক সচিব মু আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এটার বিষয়ে ঠিক জানি না। অফিস খুললে হয়তো তথ্য নিয়ে জানাতে পারবো।’

অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আর দুদকের মামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিডল্যান্ডের ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলেও আহসান উজ জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

একজন ব্যাংক ব্যবস্থাপকের এতো সম্পদ!

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অব আমেরিকার চাকরি ছেড়ে ২০০৯ সালে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে (এমটিবি) ডিএমডি পদে যোগদান করেন মো. আহসান-উজ-জামান। ২০১১ সালে এসে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংব (এমটিবি) ব্যাংকে পদোন্নতি পেয়ে অ্যাডিশনাল এমডি হন। পরে অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় এমটিভি থেকে চকুরিচ্যুত হন বলে জানা যায়। ২০১৪ সালে মিডল্যান্ড ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগদান করেন।

দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ৮৭টি ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) আছে ও ১২টি সাধারণ হিসাব নম্বর আছে। এসব হিসাব নম্বর দিয়ে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা, এসব হিসাব নম্বরের লেনদেন দুদেকর কাছে যা অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে।

এদিকে আহসান উজ জামানের এনআরবি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে শেয়ার ও মালিকানা আছে বলেও জানা যায়। কিন্তু ব্যাংকের নিয়োগবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা অন্য কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে পারেন না। এগুলোর মধ্যে গুলশানের ৩৫ নম্বর রোডে (হাউস নং-৩/এ) ১০ কাঠার প্লট, একই এলাকায় এক বিঘা জমি। ধানমণ্ডির ৬ নম্বর রোডে ১ বিঘা জমি এবং তার ওপর বাড়ি রয়েছে এই কর্মকর্তার। এছাড়া তার ঢাকায় তিনটি বাড়ি ও একাধিক ব্যক্তিগত গাড়িও আছে।

(ঢাকাটাইমস/১০মে/এসআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :