মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদল, কতটা যৌক্তিক

​​​​​​​উম্মুল ওয়ারা সুইটি
  প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:২৪| আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২১:৫৮
অ- অ+

দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবের অন্যতম অনুসঙ্ঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শোভাযাত্রা, যা বহুদিন ধরেই কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রতিরোধের ইতিহাস এবং সম্মিলিত পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু সেই শোভাযাত্রার নাম নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে বিতর্ক, যা প্রশ্ন তুলছে—বারবার নাম পরিবর্তন কতটা যুক্তিযুক্ত?

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরবর্তীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি প্রতিষ্ঠা পায়। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের আহ্বান হিসেবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে এই শোভাযাত্রা।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

কিন্তু গত দুই বছরে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা—‘মঙ্গল’ থেকে ‘আনন্দ’, এবং এখন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এটি কেবল নামের পরিবর্তন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে অনেকেই দেখছেন। সরকারের যুক্তি হলো, নাম নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা এবং আয়োজনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন হলো— এই অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনে কি প্রতিষ্ঠিত একটি নামকে বারবার পরিবর্তন করতেই হবে?

সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়, এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়— এটি সত্য। তবে সেই পরিবর্তন হতে হয় স্বতঃস্ফূর্ত, এবং সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসার নিরিখে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বারবার নামবদল অনেক সময় সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বিশেষ করে যখন একটি নাম ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, তখন তা পরিবর্তনের আগে আরও গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। ইউনেস্কো স্পষ্ট করেছে, নাম পরিবর্তন রাষ্ট্রের এখতিয়ার হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানাতে হবে। অর্থাৎ, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই যে স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে, সেটি হঠাৎ পরিবর্তন করলে আন্তর্জাতিক নথি ও বাস্তব ব্যবহারের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বের দাবি রাখে। উদীচীর মতো সংগঠনগুলো মনে করছে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি কেবল একটি নাম নয়—এটি বাঙালির মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং ঐক্যের প্রতীক। সেই প্রতীককে সরিয়ে দেওয়া মানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে দুর্বল করা।

তবে সরকারের যুক্তিকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটি রাষ্ট্র সব নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায়—এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নাম পরিবর্তনই কি সেই অন্তর্ভুক্তির একমাত্র পথ? সচেতনতা, অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটানো—এসব পদক্ষেপ হয়তো আরও কার্যকর হতে পারত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। সংস্কৃতির শক্তি তার ধারাবাহিকতায়, তার প্রতীকে, তার স্মৃতিতে। সেই জায়গাগুলোকে বারবার নাড়িয়ে দিলে সংস্কৃতির গভীরতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রা নামের চেয়ে অনেক বড়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। তাই নাম নিয়ে টানাপোড়েনের চেয়ে ঐতিহ্য ও চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখা—এই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।

লেখক: সাংবাদিক।

(ঢাকাটাইমস/৬এপ্রিল/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4