টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধ ও বাতেন বাহিনীর অবিস্মরণীয় ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এক অনির্বাণ শিখার মতো, যার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে অসংখ্য নাম জানা-না জানা মানুষের ত্যাগ, সাহস এবং আত্মোৎসর্গের কাহিনী। এই ইতিহাস কেবল রাজধানী বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি মাটির কণায়, প্রতিটি নদীর স্রোতে লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের অগণিত গল্প।
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর সেসব জনপদের একটি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি জাতীয় আন্দোলন ছিল না, বরং ছিল ব্যক্তিগত বেদনা, পারিবারিক ত্যাগ এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের এক অনন্য অধ্যায়। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন খন্দকার আব্দুল বাতেন—একজন মানুষ, যিনি নিজের দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা এবং অসাধারণ সংগঠক ক্ষমতার মাধ্যমে একটি পুরো অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলেন।
খন্দকার আব্দুল বাতেনের জীবনকথা যেন এক চলমান ইতিহাস। ১৯৪৬ সালের ১৭ মে নাগরপুর উপজেলার কনড়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা খন্দকার সিরাজুল ইসলাম এবং মাতা হাজেরা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা বাতেন শৈশব থেকেই ছিলেন দৃঢ়চেতা এবং নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। গ্রামবাংলার সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্যেও তাঁর চিন্তায় ছিল বৃহত্তর সমাজ ও দেশের কথা। শিক্ষাজীবনে প্রবেশের পর তাঁর এই বৈশিষ্ট্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
করটিয়া সা’দত কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। এই সময় থেকেই তিনি বুঝতে শুরু করেন, রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা নয়, এটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন তরুণ বাতেনও নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এই আন্দোলনের সঙ্গে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, ছয় দফা আন্দোলনের দাবি, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাপ—সবকিছুই তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকে শাণিত করে।
ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুতই একজন প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন বাতেন। ১৯৭১ সালে তিনি টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের একাংশের সভাপতি, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদগুলো তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি বিষয়—তিনি তখন একটি বৃহৎ ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস, বাঙালির ইতিহাসে এক সংকটময় অথচ গৌরবময় সময়। ২৩ মার্চ টাঙ্গাইল শহরের আদালতপাড়ায় একটি বাসভবনে সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ গঠিত হলে আব্দুল বাতেন সেখানে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। একই সময়ে তিনি টাঙ্গাইল জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
মার্চের শুরু থেকেই আব্দুল বাতেন কলেজে কলেজে ঘুরে স্বাধীনতার ইশতেহার প্রচার করতে থাকেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, আর কাজে ছিল এক অদম্য গতি। কিন্তু ইতিহাস কখনো মসৃণ পথে এগোয় না। ২৫ মার্চের কালরাত্রি সেই স্বপ্নকে আঘাত করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা শুরু হলে সমগ্র দেশ যেমন প্রতিরোধে ফেটে পড়ে, তেমনি টাঙ্গাইলও রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। ৩০ মার্চ সখিপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে সা’দত কলেজের ছাত্র জুনায়েদ নিহত হন।
৩ এপ্রিল টাঙ্গাইল শহর পাকবাহিনীর দখলে চলে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। খন্দকার আব্দুল বাতেন নিজ এলাকা নাগরপুরে ফিরে আসেন। নিজ গ্রাম কনড়াকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তোলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী, যা পরে “বাতেন বাহিনী” নামে পরিচিতি পায়।
বাহিনী গঠনের শুরুতে বাতেনের সঙ্গে ছিল মাত্র কয়েকজন ছাত্র ও তরুণ। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব, তার সাহস এবং তার নেতৃত্বের আকর্ষণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সহযোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকে। মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, মুরাদ আলী সরকার, ইসমাইল হোসেনসহ অনেকেই তাঁর ডাকে সাড়া দেন। আলী আকবর খান ডলারের মতো ব্যক্তিত্ব বহু যুবককে নিয়ে এই বাহিনীতে যোগ দেন।
ধীরে ধীরে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, এমনকি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ ও আনসারের সদস্যরাও ‘বাতেন বাহিনী’তে যুক্ত হতে থাকেন। ফলে ছোট দলটি দ্রুতই একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়।
এপ্রিল মাস থেকে তৎপরতা শুরু হলেও মূলত মে মাসে সফল অপারেশন পরিচালনা শুরু করেন বাতেন বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের প্রথম অপারেশন ছিল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থানা আক্রমণ। খন্দকার বাতেন ও সুবেদার বারীর নেতৃত্বে দুটি দল ৪ মে রাতে থানা আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনারা টিকতে না পেরে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখলে আসে।
এই বাহিনীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর সাংগঠনিক কাঠামো। সাড়ে তিন হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে গঠিত এই বাহিনী ৪১টি কোম্পানি, ১২৩টি প্লাটুন এবং ৩৭০টি সেকশনে বিভক্ত ছিল। এটি ছিল একেবারে নিয়মতান্ত্রিক একটি সামরিক কাঠামো, যা একজন তরুণ ছাত্রনেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনীর জন্য অত্যন্ত বিরল।
সুবেদার মেজর আব্দুল বারীকে ফিল্ড কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বাহিনীর সামরিক দক্ষতাকে আরও সুসংহত করে। বাতেন বাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের লাউহাটি এবং নাগরপুরের শাহবাজপুর চর—এই সব স্থানে স্থাপন করা হয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এসব ক্যাম্পে নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। অস্ত্র চালনা, গেরিলা কৌশল, রণনীতি—সবকিছুই শেখানো হতো পরিকল্পিতভাবে।
কিন্তু শুরুটা এত সহজ ছিল না। অস্ত্রের অভাব ছিল প্রকট। প্রথম দিকে মাত্র দুটি রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। স্থানীয় সহযোগিতা, বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া অস্ত্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্র—এই সবের মাধ্যমে তারা নিজেদের শক্তিশালী করে তোলে।
“শত্রুর অস্ত্রই আমাদের অস্ত্র”—এই নীতি সামনে রেখে তারা প্রতিটি অভিযানে অংশগ্রহণ করে। থানায় আক্রমণ, সেতু ধ্বংস, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা—এই সব কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে চাপে রাখে।
বাতেন বাহিনীর যুদ্ধকৌশল ছিল অত্যন্ত কার্যকর। তারা “হিট অ্যান্ড রান” পদ্ধতি অনুসরণ করত—অর্থাৎ আকস্মিক আক্রমণ করে দ্রুত সরে যাওয়া। এই কৌশল পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং ক্ষতিকর। তারা বুঝতেই পারত না, কোথা থেকে আক্রমণ আসছে এবং কখন তা শেষ হচ্ছে। ফলে বাতেন বাহিনী অল্প শক্তি নিয়েও বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।
সিঙ্গাইর থানা আক্রমণ, দৌলতপুর অভিযান, ঘিওর থানা দখল, সাটুরিয়া থানা আক্রমণ, নাগরপুর থানা দখল—এই সব অভিযান শুধু সামরিক সাফল্যই নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধির একটি বড় উৎস ছিল। প্রতিটি সফল অভিযান নতুন করে সাহস জোগাত, নতুন করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করত।
এই বাহিনীর একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের বেসামরিক প্রশাসন। যুদ্ধের পাশাপাশি তারা একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে, যা স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করত। আলী আকবর খান ডলারের নেতৃত্বে এই প্রশাসন পরিচালিত হতো। এটি প্রমাণ করে, বাতেন বাহিনী শুধু একটি সামরিক শক্তি ছিল না; বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তাঞ্চল পরিচালনার প্রয়াস।
তাদের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রচার। “অগ্নিশিখা” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা হতো, যেখানে যুদ্ধের খবর, সাফল্যের কাহিনী এবং জনগণের জন্য বার্তা প্রকাশিত হতো। এছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও তাদের সাফল্য প্রচার করা হতো, যা সমগ্র দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যেত।
যুদ্ধের এই দীর্ঘ পথে ত্যাগও কম ছিল না। বাতেন বাহিনীর ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ১৯ জন আহত হন। প্রতিটি শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে স্বাধীনতার পথ। এই ত্যাগই মুক্তিযুদ্ধকে অর্থবহ করেছে, এই ত্যাগই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে।
১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনের কাছে খন্দকার আব্দুল বাতেন তাঁর বাহিনীসহ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করেন। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে একজন যোদ্ধা যুদ্ধ শেষ করে শান্তির পথে ফিরে আসেন।
স্বাধীনতার পরও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন করেন, কারাবরণ করেন, আবার ফিরে আসেন। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, রেখে যান এক অনন্য উত্তরাধিকার।
আজ যখন আমরা নাগরপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করি, তখন খন্দকার আব্দুল বাতেনের নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি ইতিহাস, একটি চেতনা, একটি প্রেরণা। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাতেন বাহিনী প্রমাণ করেছে—সংগঠিত ইচ্ছাশক্তি, সাহস এবং দেশপ্রেম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব।
আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আব্দুল বাতেনের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাঁর জীবন, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর ত্যাগ—সবকিছুই আমাদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
লেখক: সংবাদকর্মী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































