কোম্পানির হাতে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা

জনস্বার্থ রক্ষায় ওষুধ প্রাইস কমিশন গঠন করা হোক

ড. এম. এন. আলম
  প্রকাশিত : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৪০| আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৭
অ- অ+
ছবি: এআই জেনারেটেড।

গত ৩ আগস্ট সরকার ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৯৯৪ সালের প্রজ্ঞাপনে শুধু ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকসহ হাজার হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাবে এবং ওষুধের বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

দেশের গরিব জনসাধারণকে বহুজাতিক কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি এবং দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ২৮ এপ্রিল ওষুধ নীতি প্রণয়ন করতে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ওই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। দেশমাতৃকার টানে লন্ডনে এফআরসিএস ফাইনাল পার্ট পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশে ফিরে আসা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কারসাজি ধরে ফেলেন। জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিকের বদলে ভিটামিন, অ্যান্টাসিড, টনিক, গ্রাইপ ওয়াটারসহ নানান অপ্রয়োজনীয় ওষুধে বাজার সয়লাব করে দেশের মানুষকে শোষণ করার বিষয়টি তিনি জনসম্মুখে নিয়ে এসেছিলেন।

দেশপ্রেমিক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ফার্মাজায়ান্ট প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১ হাজার ৭৪২টি ওষুধকে অপ্রয়োজনীয়/অকার্যকর ঘোষণা করতে এবং সরকার কর্তৃক সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮২ সালের ১২ জুন যুগান্তকারী ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি জারি করার পর ওষুধ শিল্পের নবযাত্রা শুরু হয়।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিষিদ্ধ, অপ্রয়োজনীয় এবং চড়া দামের ওষুধের পরিবর্তে দেশীয় কোম্পানির ওষুধকে দ্রুত রেজিস্ট্রেশন প্রদান, কাঁচামাল আমদানিসহ ন্যায্যমূল্যে বাজারজাত করার সুযোগ করে দেয় ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর। সস্তা শ্রমবাজার, কেমিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও দক্ষ জনবলের সহযোগিতায় তর তর করে বিকশিত হতে থাকে ওষুধশিল্প। সৃষ্টি হয় আজকের স্কয়ার, বেক্সিমকো, একমি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। একপর্যায়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে দেশীয় ওষুধের সুনাম।

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত উত্থানে কয়েক দশকের মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ফাইসন্স, ফাইজার, হোয়েস্ট, স্কুইব, আইসিআই, অর্গানন-এর মতো গ্লোবাল ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

বর্তমানে দেশে ৩১০টি অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানি প্রায় ৪ হাজার ৮৮০টি জেনেরিকে ৪৫ হাজার ২৯০টি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে থাকে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, নানা হুমকি-ধমকি, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে তৎকালীন সরকার ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করার ফলে ৯০-এর দশকে ওষুধশিল্পে বিপ্লবের সূচনা হয়। একটি আমদানি নির্ভর দেশ থেকে রফতানিমুখী গুরুত্বপূর্ণ খাতে ওষুধশিল্প রূপান্তরিত হয়। এর সুফল দেশের জনগণ ভোগ করছে।

কিন্তু ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করলেও অধিকাংশ কোম্পানি ওষুধের মূল কাঁচামাল (র-মেটেরিয়াল) ভারত বা চীন থেকে আমদানি করে থাকে। ফলে ওষুধের মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধিসহ মানসম্মত উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

ওষুধশিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার ২০০৭ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ার বাউশিয়ায় ২০০ একর জমিতে ২৭ কোম্পানিকে ৪২টি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) প্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও মাত্র চারটি কোম্পানি কাঁচামাল উৎপাদন শুরু করে। তাছাড়া ২০৩০ সালের ট্রিপসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোম্পানিগুলোর দক্ষ জনবল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের সক্ষমতাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে।

ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো বহুজাতিক কোম্পানিদের মতো লাগামহীন মূল্য নির্ধারণ করে মানুষের পকেট কাটার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজস্ব কাঁচামাল ও ওষুধ উৎপাদন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ডাক্তারদের গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিদেশ ভ্রমণের মতো অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকলে ওষুধের মূল্য বিদ্যমান মূল্যের চেয়ে ৫০ শতাংশ কমে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

অতএব, কোম্পানিগুলোকে বহুজাতিক কোম্পানিদের মতো আচরণ না করে দেশের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে গোষ্ঠীস্বার্থের পরিবর্তে গরিব জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে তাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার চিকিৎসা ও ওষুধ প্রাপ্তি সহজলভ্য করতে হবে।

ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কোম্পানি, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উন্নত বিশ্বের আদলে প্রাইস কমিশন গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ এর মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত ৩০ ধারা সংশোধন অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। এককভাবে কোম্পানির পরিবর্তে প্রাইস কমিশনের মাধ্যমে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হলে জনস্বার্থ সুরক্ষিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকারকে যেমন শিল্পবান্ধব হতে হবে তেমনি ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী সেক্টরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সব ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রদত্ত সুপারিশগুলো সংযোজন করে আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে প্রত্যাশা করি।

লেখক: সাবেক উপ-পরিচালক ও আইন কর্মকর্তা, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ঢাকা।

(ঢাকাটাইমস/০৩সেপ্টেম্বর/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
রাজশাহীতে পরিবেশবান্ধব গ্রীন বিল্ডিংয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
রেলওয়ের শীর্ষ তিন পদে রদবদল
সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলেন মির্জা আব্বাস
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা