মাতৃঋণের শোধ হয় না

পৃথিবীর ক্ষুদ্র শব্দ গুলোর মধ্যে "মা" শব্দটি অন্যতম। "মা " শব্দটি ছোট হলেও এর মাহাত্ম্য, গভীরতা ও মর্যাদা অপরিসীম। মায়ের মমতা, ভালোবাসা শুরু হয় যখন আমরা গর্ভে ছিলাম। এরপর ধরিত্রীতে আসার পর প্রথম স্পর্শ, স্নেহ, আলিঙ্গন মায়ের সাথেই হয়ে থাকে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটি হলেন মা। আর সব চেয়ে, নিরাপদ আশ্রয় হলো মায়ের কোল। শিশুকাল থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা সবাই আমাদের মায়ের কোলকে আমাদের প্রথম ও প্রধান আশ্রয় মনে করি। তাই বারবার ফিরে যেতে চাই মায়ের কোমল পরশ পেতে। মায়ের আদর পেতে কতইনা ভালো লাগে। কি যে প্রশান্তি তা আমরা সকলেই জানি। তবে প্রকৃতির কাছে আমরা হেরে যাই, চিরতরে হারিয়ে ফেলি মমতাময়ী মা কে। থেকে যায় শুধু স্মৃতি আর পথ চলার নির্দেশ বাণী।
বিশ্ব মা দিবসে আমি আমার মায়ের কথা বিশ্বকে জানাতে চাই। সাহসী, তেজস্বী, অন্যায়ের সাথে আপসহীন ছিলেন আমার মা। আজকের আমি হয়ে ওঠার অন্তরালে এই মানুষটার অবদান সবচেয়ে বেশি। যেকোনো শিক্ষণীয় কাজে তার অনুপ্রেরণা ছিল সব চেয়ে বেশি। আমার মা বেশ মেধাবী ছিলেন। তিনিও বিভিন্ন লেখালেখি করতেন। আমার লেখার হাত তার থেকেই পাওয়া। প্রতিটি লেখা শেষ করে সর্ব প্রথম মা কে শুনাতাম। সে আমার ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিতেন। তার অনুপ্রেরণা ছাড়া জীবন হয়তো থমকে থাকতো। জীবনে যতটুকু সাফল্য অর্জন করেছি মায়ের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাবার সমর্থনের ও অনেক গুরুত্ব রয়েছে। বাবার সমর্থন ছাড়াও এতো দূর আসা সম্ভব হতো না।
অসুস্থ হলে সারা রাত জেগে শিয়রে বসে সেবা করা মহীয়সী নারী হলেন মা। মধ্যযুগের কবি "ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর" এর বিখ্যাত সেই উক্তি - আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। কবির লেখা এই উক্তিটি যেন প্রতিটি মা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান। নিজের সকল সুখ, স্বাচ্ছন্দ, বিলাসিতা, আকাঙ্ক্ষা সবকিছুকে ত্যাগ স্বীকার করে দেয় শুধু মাত্র সন্তানের ভালো থাকার জন্য।
ছেলেবেলা থেকেই শুনছি, পড়ছি যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে হয়। এই উপদেশ বাক্যটা আমরা প্রত্যেকেই জানলেও এর মূলভাবটা কেউই অন্তস্থ করতে পারি না। মায়ের ভালোবাসা ও ত্যাগের ঋণ আমরা কখনো পরিশোধ করতে পারব না। মায়ের স্নেহ , ভালোবাসা, শাসন, আদেশ, নিষেধ, উপদেশ প্রায়ই আমরা তৎক্ষনাৎ উপলব্ধি করতে পারি না। এই উপলব্ধি বোধ জাগ্রত হয় তখন, যখন আমরা চিরকালের জন্য আমাদের স্নেহময়ী, মমতাময়ী মা কে হারিয়ে ফেলি। মা কে হারানোর পরই বুঝতে পারি মা কতো যত্ন করে, আদর- ভালোবাসা দিয়ে, বহু ত্যাগ স্বীকার করে আমাদের আগলে রেখেছিলেন।
জীবনে সংগঠিত হওয়া ভুল, অন্যায়গুলো সুন্দর করে বুঝিয়ে সঠিক আলোর পথ দেখানো মানুষটি হলেন মা। জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমরা মায়ের সাথে অসদাচরণ করি। মায়ের কষ্ট হয় তবুও সে কখনো সন্তানকে ত্যাগ করার কথা চিন্তা করেন না। কারণ সে জানে কতো কষ্ট করে সে তার সন্তানকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সন্তানের লাঞ্ছনা - গঞ্জনাকেও হার মানায়।
মা তো মা ই হয়। মায়ের সাথে কারো তুলনা হয় না। আমরা যতো ভুল ত্রুটি করি না কেনো মা সব দোষ ক্ষমা করে দিয়ে বুকে টেনে নেন। মায়ের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা একবার হারিয়ে ফেললে আর কোনো দিনও খুঁজে পাওয়া যায় না।
বাবা-মা আমাদের যেভাবে আদর, স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে বড় করেন, আমাদের জন্য যত লাঞ্ছনা - গঞ্জনা সহ্য করেন, বহু ত্যাগ স্বীকার করেন , আমরা সন্তানেরা কেনো তাদেরকে তাদের মত করে ভালবাসতে পারিনা ? আমরা সন্তানেরা, বাবা - মাকে ভালোবাসি। কিন্তু সন্তানের প্রতি বাবা-মার যে ভালোবাসা তা তুলনা করতে গেলে বাবা-মার ভালোবাসার কাছে আমাদের ভালোবাসা একদম ফিকে হয়ে যায়। বাবা-মার ভালোবাসার গভীরতা আসলে আমরা বুঝতে পারি না। তাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যা স্বয়ং আল্লাহ তাদের দিয়েছেন। মহান আল্লাহর দরবারে আকুল আবেদন পৃথিবীর প্রতিটি মা কে ভালো রেখো। আর যারা পরপারে রয়েছেন তাদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান কর।
সন্তান হিসেবে আমাদের সবার উচিত মা - বাবাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। মা - বাবার ভালোবাসার অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা।
লেখক: সদস্য, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি ফিচার কলাম এন্ড কন্টেন্ট রাইটার্স সমাজকর্ম বিভাগ, ১৭ তম আবর্তন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































