ইয়াবার পর গাঁজার গন্তব্য কক্সবাজার, জেলেদের মধ্যে বাড়ছে আসক্তি

বঙ্গোপসাগরে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া হাজার হাজার জেলের মধ্যে বাড়ছে গাঁজার ব্যবহার। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আড়ালে নীরবে বিস্তার লাভ করছে এ মাদক। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি কাটানো এবং কথিত ‘বাড়তি শক্তি’ পাওয়ার আশায় জেলেদের একটি অংশ গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জেলেদের ব্যবহার করে সাগরে ভাসমান মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে মাদকের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি সিন্ডিকেট।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে এখন গাঁজার বড় চালানও পৌঁছাচ্ছে।
র্যাব-১৫-এর উপ-অধিনায়ক মেজর এস এম মারুফ বলেন, ‘কক্সবাজার অঞ্চলে সম্প্রতি গাঁজার অনেক বড় চালান জব্দ করেছে র্যাব। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, গাঁজার চালানগুলো মূলত কুমিল্লা কিংবা ওই অঞ্চল থেকে কক্সবাজারে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ কক্সবাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেলেও গাঁজার ক্ষেত্রে উল্টো হচ্ছে। মাদকের এসব চালানের নেপথ্যে কারা, তা খুঁজে বের করতে র্যাব কাজ করছে।’
কক্সবাজারে গাঁজার বিস্তার নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘কিছু মামলা তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে গাঁজা সেবনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও গাঁজাসক্তের সংখ্যা বেড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, এ অঞ্চলে গাঁজা আসক্তের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গাঁজার চোরাচালান রোধে সর্বাত্মক কাজ করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিশেষ করে নৌঘাটগুলোয় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারসহ সাগরতীরবর্তী ১৪ উপজেলার প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিশ্রমসাধ্য। এ পেশায় কর্মঘণ্টারও নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই।
একেকজন জেলেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। দিনের পর দিন তাঁদের থাকতে হয় পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে দূরে। সমুদ্রের বৈরী পরিবেশ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং শারীরিক ক্লান্তির সুযোগেই জেলেদের একটি অংশ গাঁজার দিকে ঝুঁকছেন।
জেলেদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণাও রয়েছে—গাঁজার ধোঁয়া শরীর গরম রাখে এবং দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য বাড়তি শক্তি জোগায়। এই ধারণার কারণে অনেকে নিয়মিত গাঁজা সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে মাদক চোরাকারবারি চক্র। দুর্গম সমুদ্র এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় এসব ট্রলারকে মাদক পরিবহনের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এতে একদিকে যেমন জেলেদের মধ্যে মাদকের বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে সমুদ্রপথে মাদক চোরাচালানের নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলেদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সমুদ্রযাত্রার কঠিন পরিবেশ এবং মাদক সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নৌঘাট ও সমুদ্রপথে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদক সরবরাহের নেপথ্যে থাকা চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে কক্সবাজারে গাঁজার বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চিকিৎসকের মতে, গাঁজা সেবনের ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিয়মিত ও দীর্ঘদিন গাঁজা সেবনে একপর্যায়ে এর ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেবনের মাত্রাও বেড়ে যায়। পাশাপাশি কমতে থাকে সামাজিক ও ব্যক্তিগত দক্ষতা।
গাঁজা সেবনকারীদের মধ্যে আবেগের ওঠানামা তীব্র হতে পারে। কখনো তারা অতিরিক্ত আনন্দিত বা উচ্ছ্বসিত থাকেন, আবার কখনো মনমরা ও বিষণ্ন হয়ে পড়েন। অনেকের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কথাবার্তায় অসংলগ্নতা এবং আচরণে অস্বাভাবিকতাও দেখা দিতে পারে।
শারীরিকভাবেও বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হাত-পা কাঁপা, হাঁটাচলায় অসুবিধা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা এবং রক্তচাপের পরিবর্তন হতে পারে। শুরুতে কারও কারও ক্ষুধা বেড়ে গেলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর খাওয়ার রুচি কমে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন গাঁজা সেবনের কারণে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে। ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। আগে যেসব বিষয় আনন্দ দিত, সেগুলোর প্রতিও আগ্রহ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়ে ব্যক্তিত্ব, কর্মক্ষমতা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর।
গাঁজা ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, সন্দেহপ্রবণতা, অস্থিরতা ও হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। গুরুতর মানসিক সমস্যায় আত্মহানির চিন্তা বা চেষ্টা দেখা দিতে পারে—এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি ও অতিরিক্ত গাঁজা ব্যবহারে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে ধূমপানের মাধ্যমে গাঁজা গ্রহণ করলে ফুসফুসের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির সঙ্গে সামগ্রিক শারীরিক দুর্বলতা ও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাঁজাকে ক্ষতিকর নয়—এমন ধারণা বিপজ্জনক। নিয়মিত সেবনের অভ্যাস তৈরি হলে তা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
(ঢাকাটাইমস/৭ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন







