উত্তরাঞ্চলে শরতেই প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা

প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। কখনো মেঘে ঢাকা আকাশ, কখনো আবার উজ্জ্বল নীল আকাশ। এরই মধ্যে হালকা বৃষ্টির দেখা মিলছে। রোদ, মেঘ আর বৃষ্টির এই লুকোচুরির মধ্যেই উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভোরে দেখা দিয়েছে ঘন কুয়াশা। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের নরম চাদর আর হালকা হিমেল হাওয়া যেন আগেভাগেই জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা।
শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো ঝলমল করছে পানির বিন্দু। গাছের পাতা ও সবুজ ধানের খেতে জমেছে শিশির। কোথাও কোথাও কুয়াশার আবরণে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে আরও স্নিগ্ধ ও শান্ত।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল। জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গাছের পাতা ও সবুজ ধানের খেত শিশিরবিন্দুতে ভিজে রয়েছে। দূরের দৃশ্যও কুয়াশার কারণে অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
ভোরের এই কুয়াশা ও হালকা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষক ও দিনমজুরদের শরীরেও। প্রতিদিনের মতো সকালে মাঠে কাজে বেরিয়ে তারা টের পাচ্ছেন শীতের আগাম স্পর্শ।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, শরৎকাল শুরু হতে না হতেই এমন কুয়াশা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। দিনের বেলায় গরম থাকলেও ভোরের দিকে কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় আবহাওয়ায় শীতের আমেজ তৈরি হচ্ছে।
প্রকৃতিতে ঋতুবদলের এই আবহে শরতের সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতের আগমনী অনুভূতি। ভোরের কুয়াশা, শিশিরভেজা ঘাস আর ধানের খেতে ঝিলমিল করা শিশিরবিন্দু উত্তরাঞ্চলের জনপদে তৈরি করেছে এক মনোরম ও স্নিগ্ধ পরিবেশ। বিশেষ করে পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটে গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরের দিকে কুয়াশার উপস্থিতি শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। এতে ভোরে সড়কে যান চলাচলেও কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে।
পঞ্চগড়ের গ্রাম থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ভোর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ফলে যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা যায়।
কুয়াশার কারণে অনেক চালক হেডলাইট জ্বালিয়ে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছেন। গতকাল সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো দেখা দিলে কুয়াশা ধীরে ধীরে কেটে যায় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তন এবং আকাশে মেঘের অবস্থানের কারণে এমন আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মেঘ থাকার পর হঠাৎ আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়াও কুয়াশা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানে সর্বনিম্ন ২৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এর আগের দিন সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তিনি বলেন, শরৎকালের শুরুতে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে আবহাওয়ায় এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় আকাশে মেঘ থাকা এবং পরে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় ভোরে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভোরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও হালকা শীতের অনুভূতি হতে পারে। এ কারণে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোরের কুয়াশায় কিছুটা বিস্মিত। পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের গলেহা কান্তমনি এলাকার বাসিন্দা আইবুল ইসলাম বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে গেছে। কয়েক হাত দূরের কোনো কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসে এর আগে এমন ঘন কুয়াশা দেখেননি বলেও জানান তিনি।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চর ইসলির কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় জমিতে কাজ করতে যেতে ভয় লাগছে।
লালমনিরহাটের চর রাজপুরের গৃহবধূ রাবেয়া খাতুন বলেন, একদিকে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ভোরে ঘন কুয়াশা। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
এদিকে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ বলেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে হাসপাতালে প্রতিদিনই শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক শিশু জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও ভোরের দিকে কুয়াশার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনকে শরৎ শেষে শীতের আগমনের প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
(ঢাকাটাইমস/৯ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন







