ডিপ্রেশন থেকে ফিরে আসুন স্বাভাবিক জীবনে

ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা একটি সাধারণ গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি শুধু মন খারাপ থাকা নয়; দীর্ঘ সময় ধরে বিষণ্নতা, কোনো কাজে আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া, ঘুম ও খাবারের পরিবর্তন, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার মতো নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩২ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন।
সাধারণ দুঃখবোধ বা সাময়িক মন খারাপ সাধারণত সময়ের সঙ্গে কমে যায়। কিন্তু বিষণ্নতার ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো দিনের বেশিরভাগ সময়, প্রায় প্রতিদিন এবং অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে থাকতে পারে। এ কারণে দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিষণ্নতার একক কোনো কারণ নেই। জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক নানা কারণ একসঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। প্রিয়জনকে হারানো, নির্যাতন বা বড় ধরনের মানসিক আঘাত, দীর্ঘস্থায়ী চাপ, পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যা এবং কাজ বা পড়াশোনায় নানা সংকট বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন
বিষণ্নতার ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
- আগে আনন্দ পাওয়া কাজ ও শখের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
- দীর্ঘ সময় মন খারাপ, শূন্যতা বা হতাশা অনুভব করা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শক্তি কমে যাওয়া
- ঘুমের সমস্যা বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানো
- খাবারের অভ্যাস ও ওজনে পরিবর্তন
- মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা
- নিজেকে মূল্যহীন বা অতিরিক্ত অপরাধী মনে হওয়া
- ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীনতা
- মৃত্যুর কথা বা নিজেকে আঘাত করার চিন্তা আসা
এসব উপসর্গের কয়েকটি একসঙ্গে দেখা দিলে এবং তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিপ্রেশন থেকে নিজেকে ভালো রাখার উপায়
রুটিন মেনে চলুন
প্রতিদিনের ঘুম, খাবার, কাজ ও বিশ্রামের জন্য একটি নিয়মিত রুটিন তৈরি করুন। ছোট ছোট কাজ দিয়ে দিন শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজে ফিরে আসার চেষ্টা করুন।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। শুরুতে অল্প সময় হাঁটলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ানো যায়। WHO-ও বিষণ্নতার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরামর্শ দেয়।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে অনেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তবে একা না থেকে বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের পছন্দের কাজে ফিরুন
যে কাজগুলো আগে ভালো লাগত, সেগুলো একেবারে বাদ না দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে শুরু করুন। একসঙ্গে অনেক কিছু করার চাপ না নিয়ে ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
ঘুমের যত্ন নিন
প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সুষম খাবার খান
নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মাদক এড়িয়ে চলা জরুরি, কারণ এগুলো বিষণ্নতার অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে।
নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে কথা বলুন
নিজেকে সবসময় ব্যর্থ, মূল্যহীন বা একা মনে হলে সেই চিন্তাগুলো একা বহন না করে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে আলোচনা করুন।
প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিন
ডিপ্রেশন চিকিৎসাযোগ্য। বিষণ্নতার চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা, যেমন কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT), ব্যবহার করা হয়। মাঝারি বা গুরুতর বিষণ্নতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে। WHO-এর মতে, হালকা বিষণ্নতায় সাধারণত মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাই প্রথম সারির চিকিৎসা; অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না।
তাই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট শুরু বা বন্ধ না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিষণ্নতার সঙ্গে নিজের জীবন শেষ করা বা নিজেকে আঘাত করার চিন্তাও দেখা দিতে পারে। এমন চিন্তা এলে একা থাকা উচিত নয়। দ্রুত পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য বা কাছের কাউকে বিষয়টি জানিয়ে চিকিৎসক, কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নিতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ক্ষতি করার আশঙ্কা থাকলে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডিপ্রেশন কোনো দুর্বলতার পরিচয় নয় এবং শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে সবসময় এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নেওয়াই সুস্থ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
(ঢাকাটাইমস/১৯ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













