১০ বছর লোকসানে পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঋণের দায় নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৫| আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২০
অ- অ+

দেশের অন্যতম পুরোনো পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) মালিকানাধীন এই হোটেলের ঋণের দায় এবার নিচ্ছে সরকার। অগ্রণী ব্যাংকের কাছে বিএসএলের চূড়ান্ত দেনা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা। এই অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংককে পরিশোধ করা হবে।

তবে পুরো অর্থ সরাসরি সরকারের ব্যয় হিসেবে থাকবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকার অগ্রণী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের পর বিএসএল করপোরেট সুকুক, বন্ড ও ইকুইটি ইস্যুর মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে সমন্বয় করবে। বাকি ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে বিএসএল।

একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা বিএসএলের সম্পদ দায়মুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারকন্টিনেন্টালের ঋণ পরিশোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। তবে এখনো বাজেট থেকে অর্থ ছাড় করা হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএল টানা ১০ বছর ধরে লোকসান করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৮৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর আগের চার অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৭৯ কোটি, ৮৬ কোটি, ১১১ কোটি ও ১৮০ কোটি টাকা।

২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের লোকসান জমতে জমতে কোম্পানিটির সঞ্চিত লোকসান ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিএসএলের লোকসান হয়েছে ৩৮ কোটি টাকা।

কোম্পানিটির অডিটরও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন। ২০২৫ সালের জুন শেষে বিএসএলের ঋণ ছিল ৯০০ কোটি টাকার বেশি এবং সঞ্চিত লোকসান ছিল প্রায় ৭০৬ কোটি টাকা।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার সংস্কারের জন্য ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ নেয় বিএসএল। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মান অনুযায়ী হোটেলটি সংস্কারে মোট ব্যয় হয় প্রায় ৭২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় অংশ ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্থ কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে আসে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সংস্কার শেষে হোটেলটি আবার চালু হয়। কিন্তু এর পরপরই করোনা মহামারির প্রভাবে ব্যবসায় বড় ধাক্কা আসে। ফলে প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায় ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সমস্যায় পড়ে বিএসএল।

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের বিপরীতে বিএসএল মোট ১৯৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে। পরবর্তী সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে দেনা নির্ধারণ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়।

প্রাথমিক হিসাবে ব্যাংকের পাওনা ছিল ১ হাজার ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্লকড হিসাবে থাকা ১২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৯ টাকা সমন্বয় এবং ৪১ কোটি ৮১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯২ টাকা সুদ মওকুফ করা হয়। এর পর চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য দেনা দাঁড়ায় ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে বিএসএল ও অগ্রণী ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত হিসাব সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ঋণের পরিমাণ সুদসহ প্রায় ৯২৬ কোটি টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের পর বিএসএলকে ছয় মাসের মধ্যে করপোরেট সুকুক বা বন্ড ইস্যু করে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। এই অর্থ সরকারের কাছে পরিশোধ করতে হবে।

নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যু করা সম্ভব না হলে সপ্তম মাস থেকে সরকারকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে অর্থ দিতে হবে। তবে সুকুক বা বন্ড ইস্যু এবং সরকারের সঙ্গে অর্থ সমন্বয়ের পুরো প্রক্রিয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে শেষ করতে হবে।

অন্যদিকে, বাকি ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে একই অর্থবছরের মধ্যে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে বিএসএল।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের আর্থিক চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ঋণের দায় নেওয়া সরকারের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিএসএলের কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায় করতে না পারায় সরকারকে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বেসরকারি খাতে পরিচালনা করা উচিত। তাঁর মতে, সরকার নীতিগত বা মালিকানা পর্যায়ে থাকতে পারে, তবে হোটেল পরিচালনায় বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ৮৮৪ কোটি টাকার মতো দায় সরকারের নেওয়া কঠিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণ সাধারণত সহজে ফেরত আসে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকার অন্য কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেল যেখানে লাভ করছে, সেখানে বিএসএলের আর্থিক অবস্থার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

ডিএসইতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওয়েস্টিন ও শেরাটন ঢাকার মালিক ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর আগের দুই অর্থবছরে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল যথাক্রমে প্রায় ১৫১ কোটি ও ১৮৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের লোকসানের পেছনে সংস্কারের বিপুল ব্যয়, ঋণের সুদ, করোনা মহামারির প্রভাব এবং ব্যবসায়িক পরিবেশসহ বিভিন্ন কারণের কথা বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে হোটেলের অবস্থান ও বিমানবন্দর থেকে দূরত্বকেও বিদেশি অতিথি আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা দেশের প্রথম দিককার পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর একটি। ১৯৬৬ সালে রাজধানীর রমনার ১ মিন্টো রোডে হোটেলটি চালু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এই হোটেলটির।

হোটেলটি দীর্ঘদিন শেরাটন ব্র্যান্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়ার পর ‘রূপসী বাংলা’ নামে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএল যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের (আইএইচজি) সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি পরিচালনা চুক্তি করে।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মান অনুযায়ী সংস্কারের জন্য ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হোটেলটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়। সংস্কার শেষে ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ নামে নতুন ব্যবস্থাপনায় আবার চালু হয়।

বর্তমানে হোটেলটিতে ২২৬টি কক্ষ ও স্যুটসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, সুইমিং পুল, ফিটনেস সেন্টার, স্পা ও বড় আয়োজনের সুবিধা রয়েছে।

দীর্ঘ ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও এক দশকের বেশি সময় ধরে লোকসানের কারণে এখন রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ঋণসংকট সামাল দেওয়ার পর্যায়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সরকারের এই আর্থিক হস্তক্ষেপের পর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

(ঢাকাটাইমস/৩০ সেপ্টেম্বর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
পূর্বাচলে ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে অসদাচরণ, নারীসহ দুইজনের ৭ দিনের কারাদণ্ড
মিরপুরে ফুটপাত উচ্ছেদ ঘিরে সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন
কানাডায় অভিবাসন অভিযানে ৮ মাসে ৩৪০ বাংলাদেশি বহিষ্কার
আজকের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দিলে মিলবে ৫ শতাংশ করছাড়