ইউএইতে জনতা ব্যাংকের শাখা দেউলিয়া করার মাস্টারমাইন্ড:
দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগ সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে এজিএম আলামিন

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ব্যবসা সম্প্রসারণ ও প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুবিধা দিতে চালু হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের শাখাগুলো এখন একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ও প্রায় দেউলিয়া। একের পর এক ভুয়া এলসি জালিয়াতি ও হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এর অন্যতম মূল কারিগর সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ আলামিন জনতা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘জনতা ক্যাপিটাল’-এ বহাল তবিয়তে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলো শুরুর দিকে লাভজনক হলেও ২০১২ সাল থেকে শুরু হয় ধারাবাহিক জালিয়াতি। ২০১২ সালে মেসার্স স্টিভেন ফোরস্ট এলএলসি ১.৩ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া এলসি জালিয়াতি করে অর্থ তুলে নেয়, যা আর কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ২০১২)। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়, যা নিয়ে বর্তমানে মামলা চলমান রয়েছে (সূত্র: প্রথম আলো, ২০১৮)।
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে সাবেক আওয়ামী সরকারের উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা 'আর আর গ্লোবাল এফজেডই' (RR Global FZE) কোম্পানির মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও রাউটিং ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে জনতা ব্যাংকের আমিরাত শাখাগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয় (সূত্র: প্রথম আলো, ২০২০-২০২৪)। এসব জালিয়াতির মাধ্যমে মোটা অংকের ডলার কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এজিএম আলামিনের বিরুদ্ধে।সহযোগীরা কারাবন্দী, আলামিন বহাল তবিয়তে
জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় যুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তা ও সহযোগীদের অনেকে চাকরিচ্যুত কিংবা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও এজিএম আলামিন অদ্ভুতভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। জানা যায়, মূল ব্যাংকে দৃশ্যমান উপস্থিতি এড়িয়ে চলতে এবং বিচারিক নজরদারি থেকে বাঁচতে তিনি কৌশল হিসেবে জনতা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান 'জনতা ক্যাপিটাল'-এ সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অবসরে যাওয়ার আগে নিজেকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষায় রাখতে এবং অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ পাহারা দিতে এটি তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থায় অভিযোগের পাহাড়, মিলছে না বিচার
দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন), অর্থ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এজিএম আলামিনের বিরুদ্ধে ভুঁড়ি ভুঁড়ি লিখিত অভিযোগ জমা থাকলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার সম্পদ ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে কোনো সংস্থাই তাকে আইনের আওতায় আনতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান বি এন পি সরকারের আমলেও তিনি একই প্রশাসনিক দাপট বজায় রেখেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আলামিন ও তার পেশায় চিকিৎসক স্ত্রীর নামে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ অর্থ ও অলংকার রয়েছে।প্রশাসনের নিরবতা ও জনমনে প্রশ্ন
বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পঙ্গু হয়ে পড়েছে। কিন্তু এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ও পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও এজিএম আলামিনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার কেন নিরব—তা নিয়ে ব্যাংক খাতে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ব্যাংক খাত ও আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অতিদ্রুত তাকে পদচ্যুত করে আইনি প্রক্রিয়ায় এনে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করা না হলে জনতা ব্যাংক সহ দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে।(ঢাকাটাইমস/২৭ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













