মিশ্র ফলচাষে ভাগ্য বদল নাহিদের  

বগুড়া প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:১৪
অ- অ+

বগুড়ার ধুনটে মিশ্র ফলচাষ করে ভাগ্য বদলেছেন তরুণ উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম নাহিদ (৩৩)। প্রায় আট বিঘা জমিতে বরই, ড্রাগন ফল, পেয়ারা ও আঙুর চাষ করছেন তিনি। পাশাপাশি আনারের পরীক্ষামূলক চাষও শুরু করেছেন। ফল বিক্রির পাশাপাশি আঙুরের কলম করা চারা বিক্রি করেও আয় করছেন। এতে তার মাসিক আয় লাখ টাকারও বেশি।

নাহিদ ধুনট উপজেলার নিমগাছী গ্রামের বাসিন্দা।

নাহিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক দশক একটি ওষুধ কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাস করার পর চাকরিতে যোগ দিলেও দীর্ঘ সময় কাজ করা এবং বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ তাকে একসময় ভিন্ন কিছু করার কথা ভাবায়। এরপর ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখে কৃষিতে আগ্রহী হন।

নাহিদ বলেন, কাজ থেকে রাতে ফিরে মোবাইল ফোনে ইউটিউব দেখতেন। বিদেশি জাতের কুল চাষের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। কুল চাষে সাফল্যের পর একে একে উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফল চাষ শুরু করেন তিনি।

বর্তমানে নাহিদের প্রায় সাড়ে চার বিঘা জমিতে বরই, দুই বিঘায় ড্রাগন ফল, ১৫ শতকে আঙুর এবং প্রায় দেড় বিঘায় পেয়ারা রয়েছে। পেয়ারার জাত গোল্ডেন এইট। এছাড়া আনারের ১৬টি চারা পরীক্ষামূলকভাবে লাগিয়েছেন। জাত নির্ণয়ের পর আনারের বাণিজ্যিক চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

নাহিদ জানান, গত বছর এক বিঘা জমি থেকে বরই বিক্রি করে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ টাকা আয় করেছেন। চলতি মৌসুমে বরইগাছে ফুল এসেছে। ফল ধরার পর উৎপাদনের পরিমাণ জানা যাবে। ডিসেম্বরের দিকে বরই বাজারে আসবে।

জানতে চাইলে নাহিদ বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এক বিঘা জমি থেকে বছরে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। তবে ফল বড় ও মোটা করার জন্য টনিক ব্যবহার এবং বাজারে সরবরাহের কারণে ড্রাগনের বাজার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন লাগানো ড্রাগন গাছে সাধারণত এক বছর পর হালকা ফল আসে এবং দুই বছর পর পূর্ণ ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে তার বাগানে কিছু ড্রাগন ফল ধরেছে। সেগুলো ইতোমধ্যে খাওয়া ও বিক্রি করা হয়েছে। তবে বর্তমানে পেয়ারার কোনো ফল নেই।

নাহিদ জানান, প্রায় এক বছর আগে আঙুর চাষ শুরু করেছেন তিনি। বগুড়ার কাশিমপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) নার্সারিতে আঙুর চাষের সাফল্যের খবরও তাকে উৎসাহিত করে। এরপর রাজশাহীর একটি নার্সারি থেকে গত বছরের মে মাসে ৪০০ টাকা দরে ৯৪টি আঙুরের চারা কিনে ১৫ শতক জমিতে রোপণ করেন তিনি। চারা পরিবহনেই খরচ হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বাগান তৈরি ও সুরক্ষাজালসহ এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

নাহিদ বলেন, বর্তমানে আঙুরের তিনটি জাত নিয়ে কাজ করছেন তিনি বাইকনুর, গ্রিন লং ও ডিকসন। আগে ব্ল্যাক ম্যাজিক ও জয় সিডলেস জাতও ছিল। তবে জয় সিডলেসের ফলন কম হওয়ায় এবং গাছের আকৃতি পরিবর্তনের সময় কিছু গাছ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জাতটি আর নতুন করে লাগাননি। বর্তমানে বাগানে বাইকনুর জাতের আঙুর বেশি রয়েছে।

বাগানে এখন অফ-সিজনের কিছু আঙুর ধরেছে। তবে সেগুলো এখনো পাকেনি। সাধারণত আঙুরের মূল মৌসুম ফেব্রুয়ারি মাসে আসে। এর আগে নাহিদ এ বছর প্রায় দুই লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি কলম করা আঙুরের চারা বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করেছেন। প্রতিটি চারা ৩০০ টাকা করে বিক্রি করছেন তিনি।

নাহিদ বলেন, তার বাগান শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা নয়, আঙুরের চারা সংগ্রহের কেন্দ্রও। বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তারা তার বাগানে এসে চারা নিয়ে যান। পাশাপাশি তারা তার কাছ থেকে চাষের পদ্ধতিও জানার চেষ্টা করেন। অনেকেই নিজেদের জমিতে আঙুরসহ বিভিন্ন ফল চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তিনি বলেন, বাগানে নিয়মিত দুইজন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের প্রত্যেককে মাসে ১২ হাজার টাকা করে মোট ২৪ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। কাজের চাপ বাড়লে অতিরিক্ত আট থেকে ১০ জন শ্রমিকও কাজে নেন নাহিদ। তিনি বলেন, তার আয় মূলত সিজনভিত্তিক। তবে সিজনের আয়কে মাসিক হিসাবে ধরলে গড়ে লাখ টাকার বেশি থাকে।

আঙুর চাষে দেশের আবহাওয়াকে বড় বাধা হিসেবে মনে করেন নাহিদ। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আঙুরগাছ ও ফল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে খোলা জমির পরিবর্তে পলিহাউসে আঙুর চাষের প্রয়োজন।

নাহিদ বলেন, তার আঙুরবাগানের ওপর পলিহাউস নির্মাণে সরকারি সহায়তা চান তিনি। এরই মধ্যে পানি সাশ্রয়ে বিএডিসি থেকে স্প্রিংকলার সেচব্যবস্থা পেয়েছেন। কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পেয়েছেন পাওয়ার টিলার ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত সেচপাম্প।

নাহিদ বলেন, ভবিষ্যতে বাগানটি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বাগানের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত আট থেকে ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চান তিনি।

নিমগাছী ইউনিয়নের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রথম বছরেই আঙুর চাষে নাহিদ ভালো সাফল্য পেয়েছেন। নাহিদ নিজেই তার বাগানের প্রতিটি গাছের যত্ন নেন। এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, শুধু আঙুর নয়, ধুনট, শিবগঞ্জসহ বগুড়ার বিভিন্ন এলাকার তরুণ কৃষকেরা এখন স্ট্রবেরি, ডুমুর ও কালো ধানসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাদের অনেকেই ইউটিউব ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে এসব ফসলের চাষাবাদ পদ্ধতি শিখছেন।

(ঢাকা টাইমস/২৬সেপ্টেম্বর/এসএ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
গাজীপুরে ভেকুর চাপায় আহত বৃদ্ধের মৃত্যু
ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার আহ্বান স্পিকারের
‘কমিউনিটি ব্যাংকের লক্ষ্য শুধু মুনাফা হওয়া উচিত নয়’
সেন্টমার্টিনে অবৈধ ট্রলিং বোট ও ৭০০ কেজি মাছসহ আটক ১৭