২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ল যুক্তরাষ্ট্র, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের চূড়ান্ত প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দেশটির উত্তরাঞ্চলের এরবিল বিমানঘাঁটি থেকে শেষ মার্কিন সেনা ও সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)বিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক মিশনেরও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে।
মার্কিন সেনাদের বিদায়ের পর ইরাকের সামনে এখন নিজেদের নিরাপত্তা পুরোপুরি পরিচালনা করার চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে দেশটির রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব, শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
২০০৩ সালে যে যুদ্ধ শুরু
২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আনা হলেও পরে ইরাকে এ ধরনের অস্ত্রের মজুত পাওয়া যায়নি। সামরিক অভিযানের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটে।
এরপর ইরাকে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। তবে ইরাকি সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা এবং সাদ্দাম সরকারের বাথ পার্টির সদস্যদের প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এসব সিদ্ধান্তের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত শূন্যতা পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অন্যতম পটভূমি তৈরি করে।
তবে ইরাকের অস্থিতিশীলতার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে দায়ী করা হয় না। স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাবও দেশটির পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
আইএসের উত্থান ও মার্কিন সেনাদের প্রত্যাবর্তন
২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রথম দফার প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। তবে ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের পর ইরাকি সরকারের অনুরোধে মার্কিন বাহিনী আবার দেশটিতে ফিরে আসে। এরপর আইএসবিরোধী অভিযানে মার্কিন বিমান হামলা, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১৭ সালে ইরাকে আইএসের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। এরপরও সংগঠনটির গোপন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে আইএসের কয়েক শ যোদ্ধা সক্রিয় থাকতে পারে। তবে আগের তুলনায় সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা অনেক কমেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও বলেছে, ইরাকে আইএসের সংগঠিত সামরিক শক্তি পরাজিত হয়েছে এবং এখন দেশটির নিরাপত্তার দায়িত্ব ইরাকি বাহিনীর হাতে যাচ্ছে।
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের জন্য আরেকটি বড় বিষয় হলো দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) অন্তর্ভুক্ত ইরানপন্থী কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী এখনো নিজেদের অস্ত্র ধরে রেখেছে।
ইরাকি সরকার সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণের বিরোধিতা করছে। ফলে বাগদাদকে একদিকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে এসব শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতাও করতে হবে।
মার্কিন সেনাদের বিদায়ের ফলে ইরাকে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
আইএস কি আবার সুযোগ পাবে?
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকে আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। তবে বর্তমানে সংগঠনটি এক দশক আগের তুলনায় অনেক দুর্বল। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানেও তাদের তৎপরতা কমেছে।
তবু আইএসের গোপন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত বাড়লে সংগঠনটি সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে বাগদাদ, কুর্দি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূমিকা কী
ইরাক থেকে সেনা সরিয়ে নিলেও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাচ্ছে না। আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের কার্যক্রম এখন ইরাকের বাইরে থেকে পরিচালিত হবে। এর সদর দপ্তর জর্ডানে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং সিরিয়ায় আইএসবিরোধী কার্যক্রমে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। সামরিক জোটের মিশন শেষ হলেও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশটির নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের হাতে রাখতে পারে বাগদাদ। আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব সামলে ইরাক কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













