১ নভেম্বর: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং একটি অনিষ্পন্ন গেজেটের অপেক্ষা

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০২
অ- অ+

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে এই দিনে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক করা হয়। ঐতিহাসিক ‘মাজদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের আলোকেই মূলত এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। আজ যখন আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ১৯তম বর্ষপূর্তিতে দাঁড়িয়েছি, তখন এই দিনটির তাৎপর্য যেমন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আইনের শাসনের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা, তেমনি কিছু অমীমাংসিত প্রশাসনিক সংকট তৈরি করে গভীর উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে, সম্প্রতি অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য নতুন স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের গেজেট যথাসময়ে প্রকাশ না হওয়া এবং এর ফলে বিচারকদের মধ্যে সৃষ্ট নীরব অসন্তোষ ও উৎকণ্ঠা বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

পৃথকীকরণের ইতিহাস ও মূল চেতনা

১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবায়ন হতে লেগে যায় দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক। নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকায় দীর্ঘদিন বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রিত হতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর অধস্তন আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করার মাধ্যমে বিচারকদের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশে কাজ করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল চেতনার একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো বিচারকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা। একজন বিচারক যদি তার মৌলিক আর্থিক চাহিদা এবং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে রাষ্ট্রের অন্য কোনো বিভাগের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তবে তার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নির্ভীকভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বেতন স্কেলের গেজেট এবং বর্তমান সংকট

অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য একটি সম্মানজনক ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি বহু পুরোনো। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নতুন বেতন স্কেলের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলেও, রহস্যজনক কারণে সেই সংক্রান্ত সরকারি গেজেটটি এখনো প্রকাশিত হয়নি। একটি স্বাধীন বিভাগের কর্মকর্তাদের পেশাগত অধিকার ও আর্থিক নিশ্চয়তার বিষয়টি এভাবে মাসের পর মাস ঝুলে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ১ নভেম্বরের এই বিশেষ দিনে বিচারকদের মধ্যে আনন্দের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি দৃশ্যমান। গেজেট প্রকাশে এই দীর্ঘসূত্রতা বিচারকদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে বিচারিক গতিশীলতাকেও শ্লথ করে দিতে পারে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বনাম বিচারিক মর্যাদা

বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের পরও একটি প্রচ্ছন্ন আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন সবসময় লক্ষ্য করা গেছে। বেতন স্কেলের গেজেট আটকে থাকা বা বিলম্বিত হওয়াকে অনেক আইনজ্ঞ ও বিচারক আমলাতান্ত্রিক জটিলতারই একটি অংশ হিসেবে দেখছেন। নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছার অভাব অথবা ফাইল চালাচালির সংস্কৃতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল স্পিরিটের পরিপন্থী। বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের আর দশজন সাধারণ কর্মচারীর মতো নন; তারা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গের চালিকাশক্তি। তাদের মর্যাদা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। গেজেট না হওয়া কেবল আর্থিক বিষয় নয়, এটি বিচারকদের পেশাগত আত্মমর্যাদার সাথেও জড়িত।

স্বাধীনতার মূল্যায়নে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল কাগজের কলমে বা সংবিধানের অনুচ্ছেদে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বিচারকদের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত না হলে একজন বিচারকের পক্ষে সব ধরনের লোভ, লালসা ও চাপের ঊর্ধ্বে উঠে রায় দেওয়া কঠিন হতে পারে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যারা বিচার বিভাগে যোগ দিচ্ছেন, তারা যদি দেখেন যে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তবে এই পেশার প্রতি তরুণ মেধাবীদের আকর্ষণ কমবে। নতুন বেতন স্কেলের গেজেট দ্রুত জারি করা হলে তা বিচারকদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং বিচার অঙ্গনে আরও স্বচ্ছতা আনবে।

বিচারপ্রার্থী জনগণ ও বিচারকদের দায়বদ্ধতা

বিচারকদের এই উৎকণ্ঠার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সাধারণ বিচারপ্রার্থী জনগণের ওপর। বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে লাখ লাখ মামলার জট রয়েছে। এই বিপুল মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে বিচারকেরা দিনরাত কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি তাদের নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন স্কেল নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তবে তা তাদের মনোযোগ ও কাজের দক্ষতায় ব্যাঘাত ঘটায়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিবসের মূল লক্ষ্যই ছিল সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিচারকদের নিজেদের অধিকারই যখন গেজেটের বেড়াজালে বন্দী থাকে, তখন বিচার ব্যবস্থার সংস্কার ও মামলার জট নিরসনের পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

উত্তরণের উপায় ও আমাদের করণীয়

১ নভেম্বরের এই বিশেষ দিনে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের উচিত বিচারকদের এই যৌক্তিক উৎকণ্ঠাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। অবিলম্বে বিচারকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ করে এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সমাধান করা সময়ের দাবি। একই সাথে সুপ্রিম কোর্টেরও উচিত এই বিষয়ে কার্যকর অভিভাবকত্ব প্রদান করা, যাতে অধস্তন আদালতের বিচারকেরা নিজেদের অসহায় বা উপেক্ষিত মনে না করেন।

উপসংহার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের টিকে থাকার অন্যতম পূর্বশর্ত। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়েছিল, তার পূর্ণ রূপায়ণের জন্য বিচারকদের সব ধরনের উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত রাখা জরুরি। নতুন বেতন স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশ করার মাধ্যমে সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ দিতে পারে। ১ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের প্রত্যাশা—সব আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দেশের বিচার বিভাগ তার পূর্ণ গৌরব ও স্বাধীনতায় উদ্ভাসিত হবে এবং বিচারকেরা নির্ভীক চিত্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।

(ঢাকাটাইমস/০১ নভেম্বর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা
খিলগাঁওয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫০৫, মামলা ১৯
আশুলিয়ায় ৫ পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কর্মবিরতি, পুলিশ মোতায়েন