গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ যেন নীরব ঘাতক, সতর্ক থাকার উপায়

দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রায় নিয়মিতই দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানি ও দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটছে। দুর্বল তদারকি, মানহীন যন্ত্রাংশ ও ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে গ্যাস সিলিন্ডার এখন অনেক ঘরেই নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে গ্যাসলাইন ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অন্তত শত শত মানুষ নিহত এবং আহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ রেগুলেটর, পাইপ বা ভালভের ত্রুটি থেকে গ্যাস লিকেজ। লিকেজ হওয়া গ্যাস বদ্ধ ঘরে জমে গিয়ে চুলা জ্বালানো বা বৈদ্যুতিক স্পার্কের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটছে।
বিভিন্ন দুর্ঘটনার তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে রেগুলেটর, পাইপ বা ভালভের ত্রুটি থেকে গ্যাস লিকেজ। লিকেজ হওয়া গ্যাস বদ্ধ ঘরে জমে গিয়ে চুলা জ্বালানো বা বৈদ্যুতিক স্পার্কে বিস্ফোরণ ঘটছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এলপিজি সিলিন্ডারসংক্রান্ত ১০টি দুর্ঘটনার মধ্যে সাতটির জন্য দায়ী রেগুলেটরের ত্রুটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানহীন সিলিন্ডার ও যন্ত্রাংশের পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার এবং অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস ভরার ‘ক্রস ফিলিং’ বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। গ্রামাঞ্চলে কম দামের লোভে অনেকেই নিম্নমানের রেগুলেটর ও পাইপ ব্যবহার করছেন।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ জানান, সিলিন্ডার কেনার সময় অবশ্যই মেয়াদ, সিল ও সেফটি ক্যাপ পরীক্ষা করা জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, সিলিন্ডার খোলা জায়গায় রাখা এবং চুলা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শও দেন তিনি।
গ্যাস সিলিন্ডার, রেগুলেটর, পাইপ কেনার সময় সত্যায়িত সার্টিফাইড কোম্পানি কিংবা অনুমোদিত বিক্রেতাদের থেকে কেনা উচিত বলে মত দেন বিস্ফোরণ অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ।
তিনি জানান, সবার আগে দেখতে হবে সিলিন্ডারের গায়ে মেয়াদ দেয়া আছে কিনা।
সাধারণত একটি সিলিন্ডার ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া থাকে। যেটা সাধারণত ১০ বছর থেকে ১৫ বছর হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার কোন অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না।
সেইসঙ্গে কোম্পানির সিল, সেফটি ক্যাপ, পাইপ রাবারের রিং, রেগুলেটর ঠিকভাবে আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে নিতে হবে।
বাংলাদেশে প্রচলিত সিলিন্ডারগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হলেও এর অনেক নিম্নমানের যন্ত্রাংশ বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মি. আজাদ।
তিনি বলেন, "শুধু সিলিন্ডার ভালো হলেও গ্যাস লিক হতে পারে যদি এর পাইপ, রেগুলেটর খারাপ মানের হয়। এখানে বাজারে ভালো খারাপ দুই মানের যন্ত্রাংশই আছে। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র মানুষ অনেক সময় বাধ্য হয়ে কমদামের মানহীন পণ্য কেনে। আবার অনেকে না জেনেই নিম্নমানের পণ্য ব্যবহার করছেন। এতেই বিপত্তি ঘটে।"
এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে সিলিন্ডারটি টানা হেঁচড়া করে, ধাক্কা দিয়ে, মাটিতে গড়ানো যাবে না।
বাংলাদেশের এলপিজি বিধিমালা, সিলিন্ডার বিধিমালা এবং বিস্ফোরণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে আরও কিছু সতর্কতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হল:
- এলপিজি সিলিন্ডার খাড়াভাবে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। উপুড় বা কাত করে রাখা যাবে না। এমনভাবে রাখতে হবে যেন আশেপাশে কোন কিছুর সাথে ধাক্কা না লাগে।
- সিলিন্ডার কোন পাটাতনের ওপরে নয় বরং মাটিতে সমতল পৃষ্ঠে রাখতে হবে এবং চুলা, সিলিন্ডার থেকে কমপক্ষে ছয় ইঞ্চি উপরে রাখতে হবে।
- সিলিন্ডার কোনভাবেই চুলার/আগুনের খুব কাছাকাছি রাখা যাবে না। সিলিন্ডারটি লম্বা পাইপের সাহায্যে চুলা থেকে অন্তত তিন ফুট দূরে স্থাপন করতে হবে।
- সিলিন্ডার রান্নাঘরের চুলার নিচে, ক্যাবিনেটের ভেতরে কিংবা বদ্ধ অবস্থায় নয় বরং খোলামেলা জায়গায় এবং সমান ভূমিতে রাখতে হবে। যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে। তবে সরাসরি সূর্যের নিচে রাখা যাবে না। ছায়া যুক্ত শুষ্ক পরিচ্ছন্ন স্থানে রাখতে হবে।
- সিলিন্ডার যেখানে থাকবে সেখানকার একটি জানালা সব সময় খোলা রাখার চেষ্টা করতে হবে। না হলে ঘরের ওপরে ও নিচে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করতে হবে।
- গ্যাস সিলিন্ডার পরিবর্তনের সময় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন চুলা চালু না থাকে।
- আগুন, বিদ্যুৎ এবং তাপের যেকোনো রকম উৎস সেইসঙ্গে দাহ্য, প্রজ্বলিত বা বিস্ফোরক পদার্থ এবং ভিন্ন কোন গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে এই এলপিজি সিলিন্ডার দূরে রাখতে হবে।
- যেখানে সিলিন্ডার রাখা হচ্ছে তার আশেপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- সিলিন্ডারের ওপরে ভারী বোঝা রাখা যাবে না।
- রান্না শুরু করার আধাঘণ্টা আগে রান্নাঘরের দরজা-জানালা খুলে দিন। রান্না শেষে চুলার নব ও এলপিজি সিলিন্ডারের রেগুলেটর সুইচ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
- অনেকদিনের বদ্ধ ঘরে প্রবেশের পর সবার আগে দরজা জানালা খুলে দিতে হবে। যদি ঘরের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যায় তাহলে জানালা দরজা খুলে দিয়ে সাথে সাথে ডিলারদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে ম্যাচের কাঠি জ্বালানো, ইলেকট্রিক সুইচ, সিলিন্ডারের রেগুলেটর কিংবা মোবাইল ফোন অন বা অফ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকে সিলিন্ডারে লিকেজ খোঁজার সময় মোমবাতি কিংবা ম্যাচের কাঠি ব্যবহার করেন। সেটা কোন অবস্থাতেই করা যাবে না।
- অতিরিক্ত গ্যাস বের করার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারে চাপ দেয়া, ঝাঁকানো কিংবা সিলিন্ডার গরম করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে তরল এলপিজি দ্রুত গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে অস্বাভাবিক চাপ বেড়ে বিস্ফোরিত হতে পারে।
- এলপিজি পূর্ণ সিলিন্ডার কোন দুই চাকার যান যেমন সাইকেল মোটর সাইকেলে কিংবা ভারসাম্য কম, এমন বাহনে পরিবহন করা যাবে না।
- এছাড়া বছরে অন্তত একবার গ্যাস সিলিন্ডারটি এবং এর সাথে ব্যবহার হওয়া নানা রকম সামগ্রীর নিয়মিত ডিস্ট্রিবিউটর বা সরবরাহকারী দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।
- সিলিন্ডারের ভালভ, গ্যাসের পাইপ বা ফিটিংস দুর্বল হলে কিংবা সিলিন্ডারে ছিদ্র থাকলে সেটা সাথে সাথে বদলে ফেলতে হবে। একে মেরামত, ঝালাই করে ব্যবহার করা যাবে না। তেল বা পিচ্ছিল পদার্থ ব্যবহার করে নাড়াচাড়া করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এরপরও যেকোনো ধরণের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাসা, বিশেষ করে রান্নাঘরের মধ্যে নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, যেমন- গ্যাস ডিটেক্টর এবং ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার কিংবা হাতের কাছে কম্বলের মতো মোটা কাপড় রাখা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি, মান যাচাইয়ের পরীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানো না গেলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে।
(ঢাকাটাইমস/১৭ জানুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































