এই শহর একদিন আমাকে টেনে এনেছিল!

টরন্টো শহরটা আমার কেমন লাগে? এখানকার মানুষরা কেমন? এই প্রশ্নটা আমি প্রায়ই করি। অন্য কাউকে করি না। নিজেকে নিজে করি। নিজের সাথে আমার অনেক কথা থাকে। যেহেতু আমার কথা বলার মানুষ কম তাই নিজের সাথে নিজে কথা বলি। আমার তেমন কথাও থাকে না। কথার পিঠে কথা একদমই আসে না আমার। কেউ আমাকে কথা দিয়ে আক্রমন করলে আমি তোতালাতে থাকি। কথা হারিয়ে যায়। তাই যেখানে কথা আছে সেখানে আমি পারতপক্ষে যাই না। বস্তুতঃ আমি গর্তজীবি মানুষ। মানুষ অনেক কথা বলে। বলতে ভালবাসে। নিজের কথাই বলে বেশি। অন্যের কথা শুনতে চায় না। রাস্তাঘাটে, হোটেল রেষ্টুরেন্টে, সিনেমা হলে, লীভিংরূমে, বক্তৃতার মঞ্চে, লবিতে, পার্কে, পিকনিকে, বাসে, ট্রেনে, প্লেনে, আড্ডায় শুধু কথা আর কথা। কথা জিনিসটা যে কে আবিষ্কার করেছে! বড় ভাল জিনিস। তবে বেশিরভাগই আগড়ুম বাগড়ুম। ফেলে দেওয়ার মতো। মাঝে মাঝে দু’একটা ওজনদার কথাও শোনা যায়। তখন মনে হয় কথা তো নয় যেনো কুন্ডুল! অনেক কথার ভীড়ে আমার কথা তলিয়ে যায়। আমি কিছু বললে তা কারো কর্নকুহরে প্রবেশ করে না। অরিত্রি একদিন জেসমিনকে বলেছিল, দেখেছো বাবা একা একা কথা বলে! জেসমিন উত্তরে বলল, মাথায় ছিট আছে তাই। আমি ঘরে যে কথা বলি প্রায়ই জেসমিন শুনতে পায় না। আমি তখন রেগে যাই। জেসমিন ততোধিক রেগে বলে, মিন মিনা স্বভাবটা বদলাও। তবে আমি লিখে ভাল বোঝাতে পারি। আমার অবজারভেশন অনেক ভাল। আগামীকাল কি ঘটবে তাৱ একটা আগাম বার্তা পাই প্রায়শঃই। এই ধরণের অলৌকিক ইমাজিনেশন আমি প্রকৃতি থেকে পেয়েছি। এই কারণে আমি জীবনে অনেক অঘটন থেকে মুক্তি পেয়েছি। কানাডা আসার আগে টরন্টো সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিলনা। কানাডা নিয়ে আমি কোনো গবেষণা করিনি। কানাডা আসার আগেও আমি ইউরোপ আমেরিকা ঘুরেছি। কিন্তু কখনও কোথাও স্থায়ী হওয়ার কথা ভাবিনি। কিন্তু মানুষ যা ভাবে হয় তার উল্টো। একদিন আমি পরিবার নিয়ে কানাডা আসলাম। কেনো কানাডাকেই বেছে নিয়েছিলাম কে জানে। কানাডা না হয়ে হতে পারত আমেরিকা, হতে পারত ইংল্যান্ড বা অন্য কোনো দেশ। কিন্তু নিয়তি আমাকে কানাডার মতো চমৎকাৱ একটি দেশে নিয়ে এলো। আমি যেহেতু বিচিত্রা বা সাপ্তাহিক২০০০ এ সাংবাদিকতা করেছি তাই সাংবাদিক ক্যাটাগরিতে এপ্লাই করি। ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম লসএঞ্জেলেসে গিয়ে এবং অনায়াসেই কোয়ালিফাই করি। আমি কখনও কারো কাছে দয়া চাইনি। যখন আমার অনেক কষ্টের দিন গেছে তখনও আমি কারো কাছে হাত পাতিনি। আমি চাইলেই আমেরিকা বা অন্য কোথাও একা থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু সন্তানদের মায়ায় কোনো অনিশ্চিত জীবন বেছে নেইনি।
২
আজ থেকে বাইশ বছর আগে যখন এই শহরে পা দেই তখন আমার চোখে বিরাট কোনো স্বপ্ন ছিল না। আমি শুধু চেয়েছি আমি যেখানেই থাকব আমার সন্তানরা আমার সাথে থাকব। ওদের ছাড়া আমি থাকতে পারব না। আমি যে ধরণের সংগ্ৰামেৱ মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি আমার সন্তানদের যেনো সেটা না কৱতে হয় সেটা আমার মাথায় ছিল। জেসমিন সবসময় আমার সংগ্রামী জীবনের সাথে ছায়ার মতো থেকেছে। কখনও বিরক্ত হয়নি। হাল ছেড়ে দেয়নি। আমি যে শুধু লেখক হতে চেয়েছি জেসমিন কখনও তাতে বাঁধা তৈরী করেনি, আমার জগতে কখনো নাক গলায়নি। আমার সন্তানরাও তাই। ওরা আমাকে আমার মতো থাকতে দিয়েছে। আমার কোনো কিছুর সাথে ওরা জড়িয়ে পড়েনি। আমিও স্বাতন্ত্র বজায় রেখে চলেছি। কোনো কিছু চাপিয়ে দেইনি। সেটা আমার জন্য ভালই হয়েছে। আমি নিজে কিছুটা কমিউনিটিবেজ হলেও ওদেরকে এই জগতের নেগেটিভ কোনো কিছু যাতে স্পর্শ না করে সে ব্যাপারে আমি সচেতন থেকেছি। জেসমিন প্রচন্ড দূরদর্শী মানুষ। সে টরন্টো পা দিয়েই আবহাওয়া টের পেয়ে যায়।
আমি ২০০৪ সালে টরন্টো আসি। তার আগে এক বছর অটোয়া ছিলাম। ওরা যেমন একদমই কানাডা আসতে চায়নি। তেমনি অটোয়া থেকে টরন্টোও আসতে চায়নি। আমি জোর করে এনেছি। তখন টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটি এতো বড় ছিল না। এতো সংগঠন, সমিতি, রাজনীতি, গ্রুপিং, দলাদলি, জিঘাংসা, ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা, এতো পত্রিকা, টেলিভিশন ছিল না। টরন্টো এসে আমি একটা নতুন ভূবনের সন্ধান পেলাম। চমৎকার গোছানো একটি শহর। পৃথিবীতে কত শহরইতো দেখেছি কিন্তু টরন্টোর কোনো তুলনা নাই। টরন্টোর রাস্তায় পা দিলেই মনে হয় এটা আমার নিজের শহর। একধরনের শক্তি ও সাহস পাই। এই শহর কাউকে পর করে না। বিপদগ্রস্থ করে না। উপেক্ষা করেনা। একা একা এই শহরে বসবাস করা যায়। এটা এমনই এক শহর যে শহর যে কাউকে বুকে তুলে নেয়। তবে যত বেশি মানুষের সাথে জড়াবেন ততবেশি যন্ত্রণাময় হবে জীবন। প্ৰবাসে সৰ্বত্ৰ্য যেটা দেখা যায় সেটা হচ্ছে যার যেটা বলার কথা না সে সেটা বলছে, যার যেটা করার কথা সে সেটা করছে, যার যা হওয়ার কথা না সে তা হতে চাইছে, তখন মানিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অনেক ভাল ভাল কর্মকান্ডও হচ্ছে এই শহরে। দুর্দান্ত সব মানুষ আছে এই শহরে। ভাল মন্দ থাকবেই। কোনোকিছু নিয়েই হতাশ হওয়ার কিছু নাই। সবার সমান স্বাধীনতা। আপনি চাইলেই যে কাউকে উপেক্ষা করতে পারেন। চাইলেই কাউকে বুকে তুলে নিতে পারেন। চাইলেই নিজেকে রাজা উজির, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, সংগঠক ভাবতে পারেন। জমিদার বলে প্রচার করতে পারেন। চাইলেই কাউকে ছেটে ফেলতে পারেন। কেউ আটকাচ্ছে না। তবে সবকিছুই নির্ভর করে শিক্ষা, রুচি আর কালচারের উপর। একাডেমিক এবং পারিবারিক শিক্ষা অনেক বড় ফ্যাক্টর।৩
জীবনের সবকিছুই একটা অভিজ্ঞতা। কোনো অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না। সবকিছু থেকেই মানুষ শেখে। জীবন এমনই। আমি টরন্টো শহরটাকে ভালবাসি। এই শহর আমাকে অনেক দিয়েছে। যদিও আমি কোনো কিছুর সাথে জড়িয়ে পরিনি, আমি কোনো সভাপতি বা সেক্রেটারি নই, আয়োজক নই, সংগঠক নই, মঞ্চের লোক নই। ওসব যোগ্যতাই আমার নাই। মাইকের সামনে দাঁড়ানোর সবিশেষ ইচ্ছা আমার নাই। আমি সামনের আসনের স্যুট টাই পড়াও কেউ নই। আমি সবসময় পিছনের সারির মানুষ। আমাকে কেউ খেয়ালও করে না। সামনের আসনের বড় মানুষরা পিছনের মানুষদের দেখতে পায় না। সেটা আমার জন্য স্বস্তির। আমি বড় বড় মানুষদের সামনে একদমই সহজ হতে পারি না। তাদের মধ্যে কি একটা যেনো ব্যাপার আছে, যা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। আমার দম বন্ধ লাগে।
আমি কোনো কিছু পাওয়ার জন্য কারো কাছে ধর্না দেইনি। পৃথিবীতে কিছুই আমার কাছে অনিবার্য মনে হয় না। এটা না পেলে আমি বাঁচব না, ওটা না হলে আমার চলবে না এমন মনে হয় না। জীবনে অনেক কিছুই পাবনা তাই বলে জীবন বৃথা হয়ে যাবে না। জীবনে যা পেয়েছি তাওতো কম না। এতো পাওয়ার কথা ছিল না। বেশি পেয়েছি মানুষের ভালবাসা। সামান্য উপেক্ষা আর অবহেলা ভালবাসার তীব্রতার কাছে নস্যি। ওসব গায়ে না মাখলেও চলে। গত সতেরো বছর ধরে টরন্টো বইমেলায় আমার বই বেষ্ট সেলের তালিকায় থেকেছে। আমি যেহেতু লেখকই হতে চেয়েছি তাই এটা আমার জীবনে বড় প্রাপ্তি। কবি আল মাহমুদ বলেছেন, লেখকদের বেশি সামাজিক হতে নেই, এতে লেখক সত্ত্বা নষ্ট হয়, এটা আমি মেনে চলি।লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
(ঢাকাটাইমস/১৭ মে/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













