জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা: ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের করণীয়

আবুল ফয়েজ মোঃ হাবিবুর রহমান
  প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৩
অ- অ+

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় গ্যাস, কয়লা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় এনে আগামী কয়েক বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি বাস্তবভিত্তিক National Renewable Energy Development and Management Strategy গ্রহণ করা জরুরি।

২০৩০ সালের লক্ষ্য

২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হবে—বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমানো, শিল্পে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এ ক্ষেত্রে শুধু কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলো তা বিবেচনা করলে চলবে না। প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্য, উৎপাদন সক্ষমতা, গ্রিডের সক্ষমতা, জমির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা—সব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

১. ২০২৬–২০২৭: ভিত্তি তৈরির পর্যায়

প্রথম পর্যায়ে দেশের renewable-energy resources-এর পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা প্রয়োজন। কোথায় কতটা solar radiation, wind speed এবং biomass resource রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক database তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ, শিল্পকারখানা, EPZ, গুদাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলো চিহ্নিত করে Rooftop Solar Master Plan গ্রহণ করা যেতে পারে। এই পর্যায়ে তিনটি কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—

জাতীয় renewable-energy resource mapping;

rooftop solar-এর দ্রুত সম্প্রসারণ;

renewable-energy প্রকল্পের অনুমোদন ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা।

২. Rooftop Solar হবে প্রধান অগ্রাধিকার

বাংলাদেশে জমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি ভবনের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সরকারি অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, শিল্পকারখানা, EPZ এবং বড় commercial buildings-এ পর্যায়ক্রমে rooftop solar স্থাপন করা যেতে পারে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব অর্থায়ন, ব্যাংক ঋণ অথবা third-party financing-এর মাধ্যমে solar স্থাপনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। Net metering ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিল্পের বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমানো সম্ভব।

৩. ২০২৭–২০২৮: Solar ও Floating Solar সম্প্রসারণ

দ্বিতীয় পর্যায়ে utility-scale solar এবং floating solar প্রকল্পের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে কৃষিজমির মূল্য অত্যন্ত বেশি। ফলে renewable-energy প্রকল্পে নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অনাবাদি জমি, শিল্পাঞ্চল ও উপযুক্ত জলাশয় ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

Floating solar বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বিভিন্ন reservoir, industrial water body ও উপযুক্ত জলাশয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়ানো যেতে পারে।

৪. Wind Energy: সম্ভাবনা যাচাই করে বিনিয়োগ

উপকূলীয় বাংলাদেশে wind energy-এর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি wind-resource measurement করা জরুরি।

কক্সবাজার, কুয়াকাটা, উপকূলীয় চর ও offshore এলাকায় পর্যায়ক্রমে wind mapping করা যেতে পারে। যেখানে পর্যাপ্ত বাতাসের গতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে private sector-এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

এখানে মূলনীতি হওয়া উচিত—সম্ভাবনা নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ।

৫. Battery Storage ও Smart Grid

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় সীমাবদ্ধতা হলো উৎপাদনের ওঠানামা। সূর্য না থাকলে solar generation কমে যায়। তাই ২০৩০ সালের পরিকল্পনায় Battery Energy Storage System (BESS)-কে অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Solar power-এর সঙ্গে battery storage যুক্ত করা হলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সন্ধ্যা ও রাতের সময় ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে transmission ও distribution network আধুনিক করতে হবে। Smart grid, digital monitoring, demand forecasting এবং automated control ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

৬. শিল্প খাতে সবুজ জ্বালানি

বাংলাদেশের শিল্প খাত renewable-energy expansion-এর অন্যতম বড় ক্ষেত্র। RMG, textile, pharmaceuticals, food processing, paper, steel, cement এবং fertilizer industry-তে rooftop solar ও renewable electricity ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

সরকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে— সহজ শর্তে green financing, কর সুবিধা, দ্রুত অনুমোদন, net metering সুবিধা এবং energy-efficiency incentives দিতে পারে।

এর ফলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে green production-এর সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে।

৭. সার শিল্প ও Green Hydrogen

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি renewable-energy strategy-তে green hydrogen-এর বিষয়টি গবেষণা পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

Renewable electricity ব্যবহার করে hydrogen উৎপাদন করে ভবিষ্যতে ammonia ও fertilizer production-এর সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সার শিল্পের carbon footprint কমানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রকল্পে পরিণত করার পরিবর্তে pilot project, feasibility study এবং technology assessment-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।

৮. Biomass, Biogas ও Waste-to-Energy

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় biomass ও biogas-এরও সম্ভাবনা রয়েছে। গবাদিপশুর বর্জ্য, কৃষি অবশিষ্টাংশ ও জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে biogas উৎপাদন করা যেতে পারে।

একইভাবে বড় শহরের municipal waste-এর একটি অংশকে waste-to-energy প্রকল্পে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রথমে বর্জ্য পৃথকীকরণ, collection system এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৯. অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কার

Renewable-energy expansion-এর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। তাই সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি Green Energy Financing Framework তৈরি করতে হবে।

সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস হতে পারে—

সরকারি বাজেট, ব্যাংক ঋণ, Bangladesh Bank-এর green financing, PPP, climate finance, development partners, green bonds এবং private investment।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রকল্পের tariff, land policy, tax policy ও regulatory framework সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন।

১০. ২০২৮–২০২৯: Renewable Energy Manufacturing

শুধু বিদেশ থেকে solar panel, inverter, battery ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানি করে renewable-energy sector টেকসই করা যাবে না। ধীরে ধীরে দেশে renewable-energy equipment manufacturing শিল্প গড়ে তুলতে হবে।

Solar panel assembly, inverter, mounting structure, battery components এবং electrical equipment উৎপাদনে দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।

এতে একদিকে আমদানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

১১. দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি

Renewable-energy sector-এর জন্য প্রকৌশলী, technician, project manager, energy analyst এবং maintenance personnel প্রয়োজন হবে।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে solar technology, battery management, smart grid, energy efficiency ও renewable-energy project management বিষয়ে প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন।

১২. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়

জাতীয় renewable-energy programme সফল করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, SREDA, BPDB, BERC, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা উচিত।

প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে একটি One-Stop Renewable Energy Investment Service চালু করা যেতে পারে।

১৩. ২০২৯–২০৩০: সমন্বিত Renewable

Energy System

শেষ পর্যায়ে solar, wind, biomass, storage এবং smart grid-কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নিতে হবে।

অর্থাৎ ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাটি হবে—

Solar/Wind → Storage → Smart Grid → Industry & Consumers

এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

১৪. জমি ও পরিবেশ রক্ষা

Renewable energy পরিবেশবান্ধব হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। বিশেষ করে সৌর প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার, বর্জ্য solar panel ও battery management এবং wind project-এর ecological impact বিবেচনা করতে হবে।

প্রতিটি বড় প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।

১৫. ২০৩০ সালের সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা

সময়

প্রধান কার্যক্রম

২০২৬–২৭

Resource mapping, policy reform, rooftop solar

২০২৭–২৮

Utility solar, floating solar ও wind assessment

২০২৮–২৯

Battery storage, smart grid ও green industry

২০২৯–৩০

Renewable manufacturing,

integrated grid ও green hydrogen pilot

২০৩০

সমন্বিত renewable-energy management system

উপসংহার

বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

তবে বাস্তবতা বিবেচনা না করে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তা অর্জন কঠিন হবে। তাই ২০৩০ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত—প্রথমে rooftop solar ও grid modernisation, এরপর storage ও utility-scale

renewable energy, এবং দীর্ঘমেয়াদে green hydrogen ও দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, renewable energy ব্যবস্থাপনায় “কম খরচে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সর্বোচ্চ দেশীয় মূল্য সংযোজন এবং সর্বনিম্ন পরিবেশগত ক্ষতি”—এই তিন নীতিকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখা।

সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, শক্তিশালী গ্রিড এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি অধিক নিরাপদ, বৈচিত্র্যময় ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস্ লিমিটেড, [email protected]

(ঢাকাটাইমস/১৭ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
মহাখালী টার্মিনালে যাত্রীর ৫০ হাজার টাকা চুরি করে দৌড়, ট্রাফিক পুলিশের হাতে যুবক আটক
ইয়েমেনে ব্যাপক সংঘর্ষ ও বিমান হামলায় ১৬৮ হুতি সদস্য নিহত, আহত ৩৭৮
নেহা বোরাকে ছেড়ে দিল দিল্লি পুলিশ, আদালতে তোলা হচ্ছে দিপকেকে
কক্সবাজারে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৫