বাংলাদেশের পোষাপ্রাণীর খাদ্যবাজার: আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা

আবুল ফয়েজ মোঃ হাবিবুর রহমান
  প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩
অ- অ+

বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমাগত বহুমুখী হচ্ছে। কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় ও শিল্পায়নের পাশাপাশি নতুন নতুন ভোক্তাবাজারের বিকাশ ঘটছে। এসব সম্ভাবনাময় খাতের মধ্যে পোষাপ্রাণীর খাদ্যবাজার বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। শহরাঞ্চলে কুকুর ও বিড়াল পালন, শৌখিন মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পালন এবং কবুতর পালনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রাণীর মানসম্মত খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। পোষাপ্রাণীর খাদ্যবাজার কেবল মানুষের শখের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রাণিপুষ্টি, আমদানি-রপ্তানি, বিপণন, পরিবহন এবং কর্মসংস্থান। যথাযথ পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশে এই খাতকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজার ও বাংলাদেশের আমদানিচিত্র

বাংলাদেশে কুকুর ও বিড়ালের প্রস্তুতকৃত খাবারের বাজারে বিদেশি পণ্যের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, চীন ও ভারত ছিল বাংলাদেশে এই ধরনের খাবার সরবরাহকারী উল্লেখযোগ্য পাঁচটি দেশ।

বিশ্বব্যাংকের WITS-এ প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতথ্যে এই পাঁচ দেশের রপ্তানিমূল্য যোগ করলে প্রায় ৬৩.২৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়া যায়। তবে এই অঙ্ক কেবল পাঁচটি দেশের রপ্তানিমূল্যের সমষ্টি; এটি বাংলাদেশের মোট আমদানি নয়। অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানি হয়ে থাকতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুকুর ও বিড়ালের খাবার, শৌখিন মাছের খাবার এবং পাখির খাবার সব সময় একই

শুল্ক কোডের আওতায় পড়ে না। ফলে একটি পণ্যের আমদানি-পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ পোষাপ্রাণীর খাদ্যবাজারের আকার নির্ধারণ করা যাবে না। প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের আমদানি মূল্য ও পরিমাণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, এই বাজারে দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনুসন্ধানের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।

কুকুর ও বিড়ালের খাবার উৎপাদনে সম্ভাবনা

কুকুর ও বিড়ালের খাবার পোষাপ্রাণীর খাদ্যশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খাবার উৎপাদনে প্রাণিজ প্রোটিন,

শস্যজাত উপাদান, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হয়। তবে প্রতিটি প্রাণীর বয়স, আকার, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের উপাদান ও অনুপাত নির্ধারণ করা জরুরি।

বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাত পণ্য উৎপাদন এবং প্রাণিসম্পদ খাতে বিদ্যমান অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য নিরাপদ কাঁচামাল, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক মান নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে দেশীয় ব্র্যান্ড গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে পোষাপ্রাণীর খাদ্য সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্যের মতো নয়। এতে পুষ্টিমান, হজমযোগ্যতা, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, দূষণ প্রতিরোধ এবং পণ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাই উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় প্রাণিচিকিৎসক, প্রাণিপুষ্টিবিদ ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

শৌখিন মাছের খাবার: নতুন শিল্পের সুযোগ

বাংলাদেশে অ্যাকুয়ারিয়ামে শৌখিন মাছ পালন অনেকের কাছে জনপ্রিয় বিনোদন। এসব মাছের জন্য ফ্লেক, পেলেট, গ্রানুল এবং বিশেষায়িত খাদ্য ব্যবহার করা হয়। মাছের প্রজাতি ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাদ্যের পুষ্টিমান এবং গঠন ভিন্ন হয়।

দেশে মাছ চাষ ও মাছের খাদ্য উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকায় শৌখিন মাছের খাবার উৎপাদনে সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর

সুযোগ রয়েছে। তবে বাণিজ্যিক মাছচাষের খাদ্য এবং অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছের খাদ্য এক নয়। শৌখিন মাছের খাদ্য এমনভাবে প্রস্তুত করতে হয়, যাতে মাছের পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অ্যাকুয়ারিয়ামের পানির গুণমানও বজায় থাকে। এই খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিশেষায়িত খাদ্য উৎপাদন, প্যাকেটজাতকরণ এবং অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করতে পারেন। মানসম্মত দেশীয় পণ্য তৈরি করা গেলে আমদানির বিকল্প গড়ে তোলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

পাখি ও কবুতরের খাদ্য উৎপাদন

বিভিন্ন প্রজাতির পোষা পাখি ও কবুতরের জন্য মানসম্মত খাদ্যের চাহিদাও এই বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রাণীর খাদ্যে শস্য, বীজ, খনিজ উপাদান এবং প্রজাতিভেদে বিশেষায়িত পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশে শস্য ও বীজজাত উপাদানের প্রাপ্যতা কাজে লাগিয়ে পাখি ও কবুতরের খাদ্য প্রস্তুতের সুযোগ রয়েছে। তবে সব প্রজাতির পাখির পুষ্টির চাহিদা এক নয়। পাখির বয়স, প্রজননকাল, শারীরিক অবস্থা ও প্রজাতির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী খাদ্যের গঠন নির্ধারণ করতে হবে।

বিশেষ করে ছত্রাকযুক্ত শস্য, দূষিত কাঁচামাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করলে প্রাণীর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই কাঁচামালের মান পরীক্ষা, পরিচ্ছন্ন উৎপাদনব্যবস্থা এবং উপযুক্ত সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ

পোষাপ্রাণীর খাদ্যশিল্প গড়ে উঠলে শুধু উৎপাদন কারখানায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না; এর সঙ্গে যুক্ত হবে কাঁচামাল সংগ্রহ, প্যাকেটজাতকরণ, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও খুচরা বিক্রয়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিশেষায়িত খাদ্য উৎপাদন, অনলাইন বিপণন এবং পোষাপ্রাণীর প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। দেশীয় ব্র্যান্ডের বিকাশ ঘটলে ভোক্তাদের পছন্দ বাড়বে এবং গুণগত মান ও মূল্যের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের প্রথমে বাজারের প্রকৃত চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে। পর্যাপ্ত বাজার গবেষণা ছাড়া বড় বিনিয়োগ করলে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সরকারের নীতিগত করণীয়

এই শিল্পের টেকসই বিকাশে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথমত, পূর্ণাঙ্গ বাজারতথ্য সংগ্রহ

কুকুর ও বিড়াল, শৌখিন মাছ, পাখি ও কবুতরের খাবারের আমদানি মূল্য, পরিমাণ, উৎসদেশ এবং দেশীয় উৎপাদনের তথ্য নিয়মিত সংকলন করা প্রয়োজন। এতে বাজারের প্রকৃত আকার ও আমদানিনির্ভরতা নির্ধারণ সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার

দেশীয় ও আমদানিকৃত খাদ্যের উপাদান, পুষ্টিমান, নিরাপত্তা, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং সংরক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসারে মানসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা

সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার সুবিধা, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং উপযুক্ত অর্থায়নের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহায়তার ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারচাহিদা ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে কীভাবে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার উৎপাদন করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, রপ্তানির সম্ভাবনা অনুসন্ধান

দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারলে আঞ্চলিক ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য গন্তব্য দেশের মান, নিরাপত্তা, নিবন্ধন ও আমদানি-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।

২০২০–২০২৪ সালের আমদানি

এই শিল্পের প্রকৃত বিকাশ মূল্যায়নের জন্য ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমদানির মূল্য ও পরিমাণের ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাজারের সম্প্রসারণ, সরবরাহকারী দেশের পরিবর্তন এবং আমদানির ওপর নির্ভরতার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের সঠিক শুল্ক কোড শনাক্ত না করে একটি মাত্র কোডের ভিত্তিতে পুরো বাজারের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা যাবে না। বাংলাদেশ কাস্টমস ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতথ্য ব্যবহার করে কুকুর-বিড়াল, মাছ ও পাখির খাবারের পৃথক পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনের পরিমাণ, বাজারমূল্য এবং কর্মসংস্থানের তথ্য পাওয়া গেলে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের পোষাপ্রাণীর খাদ্যবাজারকে শুধু আমদানিনির্ভর ভোক্তাবাজার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ,

প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নিরাপদ কাঁচামালের ব্যবহার এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দেশীয় শিল্পায়নের একটি নতুন ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব হবে প্রকৃত বাজারচাহিদা বুঝে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পণ্য উৎপাদন করা। অন্যদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাণিপুষ্টি ও উৎপাদনপ্রযুক্তির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

আমদানির বিকল্প তৈরি, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনা অনুসন্ধানের মাধ্যমে পোষাপ্রাণীর খাদ্যশিল্প বাংলাদেশের

অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক উৎপাদন, কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস্ লিমিটেড, [email protected]

(ঢাকাটাইমস/১১ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দিল্লির বিক্ষোভে আটকের পর ছেড়ে দেয়া হলো সিজেপির দীপকেসহ তিন নেতাকে
রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানালো বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস আজ
বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান হবে: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী