সুশাসন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। একটি দেশের ব্যাংক শুধু আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে, বিনিয়োগকে উৎপাদনে এবং উৎপাদনকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের প্রধান মাধ্যম। অথচ ঋণ বিতরণে অনিয়ম, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতি এই আর্থিক মধ্যস্থতাকে দুর্বল করে দেয়। তখন প্রকৃত উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পান না, অথচ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবসম্পন্ন গোষ্ঠী বিপুল অর্থের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৫.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি বিনিয়োগের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের সমস্যাকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও প্রতিফলন। ব্যাংকিং সংস্কার তাই কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর কর্মসূচি হতে পারে না। প্রয়োজন স্বাধীন ও কার্যকর তদারকি, ঋণ অনুমোদনে পেশাগত দক্ষতার নিশ্চয়তা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশ, জালিয়াতির তদন্ত এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি, রপ্তানিমুখী নতুন শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বচ্ছ ও ঝুঁকিভিত্তিক ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে ব্যাংক সংস্কারের নামে নির্বিচারে ঋণসংকোচনও সমাধান নয়। প্রকৃত ব্যবসায়ীকে কার্যকরী মূলধন থেকে বঞ্চিত করলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং প্রয়োজন ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, নগদ প্রবাহভিত্তিক মূল্যায়ন, যথাযথ জামানত ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঋণমূল্য নির্ধারণ। ব্যাংকের সাফল্য কত টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার ওপর নয়; বরং সেই ঋণ কতটা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও টেকসই আয় সৃষ্টি করেছে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।
স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি বলতে এমন কোনো অর্থনীতি বোঝায় না, যেখানে বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য থাকবে না কিংবা সব পণ্য দেশের ভেতরেই উৎপাদিত হবে। আধুনিক বিশ্বে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা হলো—খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিল্পের কাঁচামাল ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি কমানো, দেশীয় উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পর্যাপ্ত ও বহুমুখী উৎস তৈরি করা। অর্থাৎ লক্ষ্য হবে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যেও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জন।
এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা। দুর্বল কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে রাষ্ট্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে করের হার নির্বিচারে বাড়ানোর পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, সম্পদ ও আয়সংক্রান্ত তথ্যের কার্যকর সমন্বয়, কর অব্যাহতির যৌক্তিক পর্যালোচনা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধ জরুরি। সাধারণ বেতনভোগী ও নিয়মিত করদাতার ওপর চাপ বাড়িয়ে অথচ বড় আয়ের বহু উৎসকে করজালের বাইরে রেখে ন্যায়সংগত রাজস্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। করদাতাকে বুঝতে হবে, তাঁর দেওয়া অর্থ অপচয় বা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং উন্নত জনসেবা ও উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যয় হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে সনদনির্ভরতা থেকে দক্ষতানির্ভরতায় রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদ, কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে সেই সম্ভাবনাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও বিশ্লেষণী চিন্তার ভিত্তি শক্তিশালী করা; কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা; বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বৃদ্ধি; এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
শুধু বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পশক্তি গড়ে তোলা যায় না। প্রযুক্তি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ, অভিযোজন এবং শেষ পর্যন্ত নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প, কৃষিপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এমন সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু একটি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈশ্বিক চাহিদা, বাণিজ্যনীতি, শ্রমব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তনের মুখে অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রকৌশলপণ্য, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ ও সামুদ্রিক অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা রপ্তানিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে স্থায়ী সুবিধা দেওয়া নয়; বরং রপ্তানিকারকদের জন্য সমান সুযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দক্ষ শ্রমশক্তি, সহজ শুল্কপ্রক্রিয়া, কার্যকর বন্দর এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যে শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম, তাকে বিকশিত হতে দিতে হবে; আর যে শিল্প কেবল স্থায়ী ভর্তুকি ও সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল, তার ক্ষেত্রে সহায়তার যৌক্তিকতা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আমদানিনির্ভর জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দক্ষতা বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার নামে পরিবেশগত ক্ষতি কিংবা অস্বচ্ছ চুক্তিকে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না। স্বচ্ছ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি করতে হবে।
বাংলাদেশের ভূগোলকে এখানে প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগর, নদীপথ, আঞ্চলিক বাজারের নৈকট্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বন্দর, লজিস্টিকস, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো সম্ভব। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং অভিযোজনমূলক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাঁচটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, আইন ও নীতির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে ক্ষমতা বা পরিচয়ের পরিবর্তে নিয়ম সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে; প্রকল্পের আকার নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল হবে মূল্যায়নের মাপকাঠি। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পেশাগত স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। চতুর্থত, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও অপ্রয়োজনীয় অনুমোদনের স্তর কমাতে হবে। পঞ্চমত, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বাধীন গবেষণা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি রাজনৈতিক জবাবদিহিও অপরিহার্য। ভালো প্রতিষ্ঠান এমন ব্যবস্থা, যা কেবল ভালো শাসকের ওপর নির্ভর করে না; বরং ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তন হলেও নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি, প্রকল্প অনুমোদন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা ও স্বচ্ছ মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থের অধীন রাখা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তবে প্রতিষ্ঠান সংস্কারকে কেবল আইন প্রণয়ন বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বাস্তবায়ন, নিরীক্ষা, শাস্তির নিশ্চয়তা এবং নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একটি আইন তখনই কার্যকর, যখন তার প্রয়োগ ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।
জ্যারেড ডায়মন্ডের গবেষণা আমাদের শেখায়, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপেক্ষা করে সভ্যতার ইতিহাস বোঝা যায় না। অ্যাসেমোগলু, জনসন ও রবিনসনের গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, একই রকম ভৌগোলিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার বিন্যাসের কারণে দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিণতি ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর। নদী, উর্বর জমি, সমুদ্র, শ্রমশক্তি ও কৌশলগত অবস্থান আমাদের সম্ভাবনা তৈরি করেছে; কিন্তু সুশাসন, দক্ষতা, প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং ন্যায়সংগত সুযোগ ছাড়া সেই সম্ভাবনা টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপ নেবে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ তাই কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, নতুন কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হচ্ছে, শ্রমিকের প্রকৃত আয় বাড়ছে কি না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন পাচ্ছেন কি না, শিক্ষিত তরুণেরা দক্ষতার উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন কি না এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুফল কতটা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি যদি বৈষম্য বাড়ায়, আর্থিক খাতকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ায়, তবে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
বাংলাদেশের সামনে আজ দুটি পথ। একটি হলো পুরোনো কাঠামোর ভেতরে সাময়িক সুবিধা ও সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করা; অন্যটি হলো প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন উন্নয়ন মডেল নির্মাণ করা। দ্বিতীয় পথটি কঠিন, কারণ এতে স্বার্থগোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা কমাতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারকে নিয়মের অধীন করতে হবে এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে না শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে, সস্তা শ্রমের সুবিধায় কিংবা উন্নয়নের উচ্চাভিলাষী ঘোষণায়। তার জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইন আস্থার ভিত্তি, ব্যাংক উৎপাদনের সহায়ক, শিক্ষা উদ্ভাবনের উৎস, করব্যবস্থা জনকল্যাণের অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা জবাবদিহির অধীন। শেষ পর্যন্ত কোনো জাতির ভবিষ্যৎ তার ভূখণ্ডের আয়তন কিংবা সম্পদের পরিমাণ দিয়ে এককভাবে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সেই জাতি তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য কেমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে, তার ওপর। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন তাই একটাই—আমরা কি কেবল সম্পদ আহরণকারী অর্থনীতি হয়ে থাকব, নাকি দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সুশাসনের শক্তিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে সক্ষম একটি উৎপাদনশীল জাতিতে পরিণত হব?
লেখক: ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
(ঢাকাটাইমস/১০ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












