রাজনীতিতে ‘স্পিড মানি’ ও ওয়াশিং মেশিন সিন্ড্রোম: ত্যাগী কর্মীদের আর্তনাদ ও তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
  প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭
অ- অ+

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ই আগস্ট এক অবিস্মরণীয় মহেন্দ্রক্ষণ। ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত হয়ে একটি নতুন ভোরের সূর্য দেখেছিল এ দেশের মানুষ। এই পরিবর্তনের পেছনে যারা বুকের তাজা রক্ত, যৌবনের সোনালী দিন আর সীমাহীন আত্মত্যাগ বিলিয়ে দিয়েছেন, তারা হলেন রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূলের ত্যাগী নেতা-কর্মী। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করা সেই সকল মাঠপর্যায়ের কর্মীরা, যারা একসময় মৃত্যুমুখেও স্লোগান তুলেছিলেন-

“খালেদা জিয়া ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই;

তারেক রহমান ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই।”

পুলিশের প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যে তরুণ অবলীলায় এই স্লোগান দিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, আজ ক্ষমতার সমীকরণে সেই ত্যাগী মুখগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খুলনার "সাইফুল খানের" মতো অজস্র কর্মীর করুণ চিত্র আজ পুরো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নির্মম চালচিত্র। যে কর্মী দলের দুঃসময়ে রাজপথে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ দল যখন এক নতুন দিগন্তে, তখন তিনি হাসপাতালের বিছানায় নিঃসঙ্গ, যন্ত্রণাকাতর। অথচ স্থানীয় নেতাদের ব্যস্ততার তালিকায় তাঁর স্থান নেই। ত্যাগী কর্মীদের এই দীর্ঘশ্বাস ও উপেক্ষা আজ এক গভীর প্রশ্ন চিহ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: আমরা কি সত্যিই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চেয়েছিলাম?

‘স্পিড মানি’ ও ওয়াশিং মেশিন সিন্ড্রোম: এক গভীর ক্ষত

অপরাধবিজ্ঞান ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বহু এলাকায় এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক ‘political metamorphosis’ বা রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে। ৫ই আগস্টের আগের কট্টর আওয়ামী লীগ নেতারা রাতারাতি বিপুল পরিমাণ ‘স্পিড মানি’ বা অবৈধ অর্থ ছিটানোর মাধ্যমে নব্য বিএনপিতে পরিণত হয়েছেন। কিছু সুযোগসন্ধানী ও বড় নেতার প্রশ্রয়ে এই অর্থ কাজ করছে এক জাদুকরী ‘ওয়াশিং মেশিন’ হিসেবে, যা অতীতের সমস্ত অপকর্ম ধুয়ে-মুছে তাদের রাতারাতি শুদ্ধ জাতীয়তাবাদী বানিয়ে দিচ্ছে।

বিপরীতে, যে ত্যাগী কর্মীর পকেটে ‘স্পিড মানি’ নেই, যিনি সততা ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বছরের পর বছর মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তিনি আজ নবাগত মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। অধিকাংশ বড় নেতা আজ ‘ইয়া নাফসি’ বা ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক নৈতিকতার স্খলন নয়, বরং সুশাসনের জন্য এক বিরাট অন্তরায়। ক্ষমতার এই বাণিজ্যিকীকরণ ও আদর্শের বিচ্যুতি তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা (Alienation) তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের কাঠামোগত ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে।

১২ই ফেব্রুয়ারির পরবর্তী বাস্তবতা এবং নেতাদের দ্বিমুখী আচরণ

নির্বাচনী বা রাজনৈতিক রূপান্তরের কঠিন মুহূর্তে বিএনপির যে সকল তৃণমূল কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন, আজ সময় বদলাতেই সেই সকল তথাকথিত শীর্ষ নেতাদের আচরণে আকাশ-পাতাল তফাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন তারা অবাঞ্ছিত। একবার দেখা করতে গেলে এমন নিরুৎসাহী ও রূঢ় ব্যবহার করা হয়, যাতে দ্বিতীয়বার কেউ আর তাঁদের আশেপাশে যাওয়ার সাহস না পায়।

অথচ এই সকল সুবিধাবাদী নেতারা যখন দলের নীতি-নির্ধারক ও আশার আলো জনাব তারেক রহমানের সামনে যান, তখন এক সম্পূর্ণ কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরেন। তারা বোঝাতে চান যে, তৃণমূলের কর্মীদের যেন স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সস্তা ভিউ ও প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তৃণমূলের প্রকৃত হাহাকার। এটি এক ধরণের রাজনৈতিক দুর্নীতি ও প্রতারণা। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলে দেখা যাবে, এই সকল নেতাদের মুখের মুখোশ উন্মোচিত হতে বাধ্য।

তারেক রহমানের প্রতি আকুল আবেদন এবং তৃণমূলের পুনর্বাসন

বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন এবং বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জনাব তারেক রহমানের কাছে আজ দেশের কোটি কোটি সমর্থক ও চিন্তাশীল নাগরিকের আকুল আবেদন—আপনার ত্যাগী কর্মীদের রক্ষায় অবিলম্বে দৃশ্যমান ও কঠোর উদ্যোগ নিন। দল যখনই সংকটে পড়েছে, এই তৃণমূলের কর্মীরাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, কোনো বড় নেতা বা সুবিধাবাদী কর্পোরেট চক্র নয়।

তৃণমূল কর্মীদের শুধু দলীয় সহানুভূতি দিলেই চলবে না, তাদের রাষ্ট্রীয় সেবায় ও দেশের মূল ধারার উন্নয়নে নিয়োজিত করার প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে:

তৃণমূল মূল্যায়ন সেল গঠন: প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় দলের সৎ ও পরীক্ষিত কর্মীদের তালিকা তৈরি করে তাদের পুনর্বাসন ও যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’: ‘স্পিড মানি’র বিনিময়ে যে সকল আওয়ামী লীগের দোসররা দলে ভিড়েছে, তাদের চিহ্নিত করে অনতিবিলম্বে বহিষ্কার করতে হবে। ওয়াশিং মেশিন সিন্ড্রোম বন্ধ করতে হবে।

সক্রিয় রাষ্ট্র সেবায় অন্তর্ভুক্তি: ত্যাগী ও শিক্ষিত তরুণ কর্মীদের কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, তাদের সুশাসন, মানবাধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাঠামোতে সক্রিয় রাষ্ট্র সেবার সুযোগ দিতে হবে।

অতএব, রাজনৈতিক দল যখন তার মূল আদর্শ থেকে চ্যুত হয়ে পুঁজি আর চাটুকারিতার বৃত্তে বন্দী হয়, তখন তার জনভিত্তি ধসে পড়ে। বিএনপিকে যদি বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘস্থায়ী আস্থার প্রতীকে পরিণত হতে হয়, তবে ত্যাগী কর্মীদের চোখের জল মুছতে হবে সবার আগে। আশা করি, জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দল এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরে আসবে এবং ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে এক নতুন, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশের সূচনা করবে।

লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ

(ঢাকাটাইমস/১০ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
তেজগাঁওয়ে ৮ হাজার ৪০০ ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
সুশাসন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন
পুলিশের রহস্য উদঘাটন: অটোরিকশাচালক সুমনই তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫২৩, মামলা ৪০