বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ

প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
  প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫১
অ- অ+

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজ এক অভূতপূর্ব সংকট অতিক্রম করছে। খেলাপি ঋণের (NPL) লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কেবল কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক মন্দার ফল নয়; এটি ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনের ১.৬৩ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৬ সালে তা ৪.৬৮ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়ে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই কাঠামোগত উত্থান দীর্ঘদিনের দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন, অনিয়ন্ত্রিত নিয়ন্ত্রক আত্মসাৎ (regulatory capture) এবং সম্পর্কিত পক্ষকে ঋণ প্রদানের ফল। সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করতে হবে। শিক্ষকতা পেশা থেকে উঠে আসা মানিটারি ইকোনমি (মুদ্রা অর্থনীতি) ও ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিতে (আর্থিক অর্থনীতি) দক্ষ একজন প্রকৃত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা অর্থমন্ত্রীকেই করতে হবে। আর্থিক সুশাসনের একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।বিআইবিএম (BIBM) এবং আইবিবি (IBB) ব্যাংকারদের মধ্যে নীতি ও নৈতিকতা তৈরি করতে এবং তাদের এই ব্যর্থতার দায় নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু আলোচনার আয়োজন করা নৈতিকতার উন্নয়নে কখনো সাহায্য করেনি।ব্যাংকিং খাতে লুৎফর রহমান সরকার, খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, অধ্যাপক হাবিবুর রহমান (চেয়ারম্যান, সোনালী ব্যাংক) মতো ব্যক্তিত্বের অভাব রয়েছে। তবে এর উন্নয়নে অধ্যাপক শান্তি নারায়ণ ঘোষের এবং জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

এই সংকটের মূলে রয়েছে গভীর নৈতিক ধস। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দাপটে আজ সৎ ও পেশাদার ব্যাংক কর্মকর্তারা কোণঠাসা। অসাধু কর্মকর্তাদের অন্যায় নির্দেশ, স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত এবং জালিয়াতির সংস্কৃতি এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে সৎ কর্মকর্তারা সততা বজায় রেখে কাজ করতে মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রবাদটি সত্য—"For dishonest bankers, honest bankers cannot work."

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা—উপ-মহাব্যবস্থাপক (DGM) থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) পর্যন্ত—অনেক ক্ষেত্রেই পদকে নিজেদের ও পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ব্যাংক কর্মী ও তাদের পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির সাথে প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির শক্তিশালী সমান্তরাল সম্পর্ক (সহসম্পর্ক প্রায় ০.৯৮) বিদ্যমান।

সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী স্থানে অসাধু কর্মকর্তারা থাকলে সৎ কর্মকর্তাদের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করা হয়। ঋণ মূল্যায়ন (Credit Appraisal) বা জামানত যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা সৎ কর্মকর্তারা ভুয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রত্যাখ্যান করলে তাদের ওপর বদলি, পদোন্নতি বঞ্চিতকরণ বা হেনস্তার হুমকি আসে। ফলে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের "অপরাধীকরণ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

আইনি হাতিয়ারের অভাব বাংলাদেশে নেই:দুদক আইন, ২০০৪: ধারা ২৬(২) ও ২৭(১) অনুযায়ী অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদ গোপন করা অপরাধ। অভিযুক্তকে অর্জিত সম্পদের "সন্তোষজনক ব্যাখ্যা" দিতে হয়।

  • মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২: BFIU-কে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট না করার জন্য প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড বা লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা দেয়।
  • ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১: সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেনে কড়াকড়ি এবং অনৈতিক সুবিধা বন্ধে নির্দেশাবলী ধারণ করে।

তবে প্রয়োগের মূল সমস্যা হলো—এসব ব্যবস্থা ব্যাংকের নিজস্ব কমপ্লায়েন্স বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। যখন অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকের নিজের DGM বা MD জড়িত থাকেন, তখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) তৈরি হয়। BFIU-এর নিয়ম থাকলেও অধীনস্থদের পক্ষে ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে STR দায়ের করা পেশাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ বছরের বদলি ও বাধ্যতামূলক ছুটির নিয়ম শাখা ব্যবস্থাপকদের জন্য প্রযোজ্য হলেও MD ও DMD-রা এর বাইরে থাকেন। ব্যাংক নির্বাহীদের নিজস্ব লেনদেনও সাধারণ গ্রাহকদের মতো কঠোর পরিশ্রুততার আওতায় থাকে না।

স্ত্রী, সন্তান বা ভাইবোনের নামে সম্পদ নিবন্ধন দুর্নীতির একটি সাধারণ প্যাটার্ন:সাবেক DGM শিপার আহমেদ: ভাইবোনদের মাধ্যমে অবৈধ আয় পাচারের প্রমাণ মিললেও মূল অনিয়ম থেকে তদন্ত ও মামলা চূড়ান্ত হতে ৮ বছর সময় লাগে।সাবেক BASIC ব্যাংক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু: তার পরিবারে বিপুল পরিমাণ অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য উঠে আসে।

এটি স্পষ্ট যে প্রয়োগ ব্যবস্থা মূলত ঘটনা-চালিত, নিয়ম-চালিত নয়।

স্বাধীন সম্পদ যাচাই ইউনিট: বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বাধীন ইউনিট গঠন করে AVP/AGM থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সম্পদ বিবরণীর স্পট-চেক এবং NBR ও ভূমি ভূমিকার তথ্যের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ক্রস-ম্যাচ করতে হবে। সরাসরি গোপনীয় BFIU চ্যানেল: ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কমপ্লায়েন্স এড়িয়ে সরাসরি whistleblowing-এর জন্য সুরক্ষিত চ্যানেল চালু করতে হবে। ৩. স্বয়ংক্রিয় সম্পদ ট্রেসিং: কর্মকর্তা সম্পৃক্ত STR এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রকৃত সম্পদ ও জীবনযাত্রার মান যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে হবে। ৪. বাধ্যতামূলক ছুটি ও রোটেশন: DGM থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের সব নির্বাহীকে বাধ্যতামূলক বদলি ও ছুটির নীতির আওতায় আনতে হবে। কমপ্লায়েন্স ব্যর্থতায় ফৌজদারি দায়: অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি দমনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স প্রধান ও MD-কে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়ের আওতায় আনতে হবে।

কেবল কাগজে-কলমে তথ্য জমা নয়, প্রকৃত মালিকানা ও জীবনযাত্রার অসঙ্গতি তদন্ত করতে হবে। ব্যাংক, দুদক, BFIU, এনবিআর ও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের সমন্বিত ডেটাবেজ আবশ্যক।

ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে যুক্ত কর্মকর্তাদের আদায় ব্যর্থতার সরাসরি জবাবদিহিতায় আনতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা অসাধু উদ্দেশ্যে ঋণ দিলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার "ঋণ বিতরণকারীর দায়" নীতি কার্যকর করতে হবে।

যেহেতু বৃহৎ খেলাপি ঋণগুলো শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের একাংশ নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর যোগসাজশে ঘটে, তাই "Shared Accountability Framework" প্রয়োগ করা জরুরি। ঋণগ্রহীতা ও কর্মকর্তা উভয়ের ভূমিকা ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া, "Credit Accountability Tracking System" ডিজিটালভাবে চালু করলে ঋণ অনুমোদনের প্রতিটি ধাপের দায় চিহ্নিত করা সহজ হবে।

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক (DGM), যার স্ত্রী একজন সরকারি কলেজের শিক্ষক, তারা ভাটারা এলাকায় ১.৭৫ কোটি টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট কেনার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তারা মিরপুর এলাকায় একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা চালান এবং এক শিক্ষককে তার নিবন্ধিত (রেজিস্টার্ড) কার পার্কিং স্থান বাতিল করার হুমকি দেন। তারা নিবন্ধিত দলিল দেখতে চান এবং তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করার চেষ্টা করেন। এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে প্রচলিত একাধিক আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কমপ্লায়েন্স নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন। সরকারি চাকরির বিধিমালা এবং ব্যাংকিং খাতের 'অফ-সাইড সুশাসন' (Off-site Governance) অনুযায়ী, পদমর্যাদা বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা এবং অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন সম্পূর্ণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

  • সম্পদের অসঙ্গতি: একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকের যৌথ বৈধ আয়ের সাথে কোটি টাকার বেশি মূল্যের ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি ক্রয়ের চেষ্টার সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করার এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে।
  • BFIU-তে রিপোর্ট: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন ও সম্পদ অর্জন পর্যবেক্ষণ করে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন।

  • অবৈধ সম্পদ অর্জন: দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ২৬ ও ২৭ অনুযায়ী, পরিচিত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে দুদকে লিখিত অভিযোগ বা তাদের হটলাইন ১০৬-এ সরাসরি অবহিত করা যায়।
  • সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ওই শিক্ষকের সম্পদের উৎস এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টিও দুদকের এখতিয়ারে পড়ে।

সাধারণ ডায়েরি বা মামলা: রেজিস্টার্ড কার পার্কিং স্পেস বাতিল বা দখল করার হুমকি দেওয়া, রেজিস্ট্রি দলিল জোরপূর্বক দেখতে চাওয়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য নিকটস্থ থানায় অবিলম্বে একটি সাধারণ ডায়েরি করা উচিত।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়

  • সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ দ্বারা আবদ্ধ। কোনো সরকারি শিক্ষক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারো সম্পত্তি দখল বা হুমকি প্রদানে লিপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ পেশ করা যায়।
  • পি কে হালদার যদি আন্তর্জাতিক পলাতক আসামি এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ধসের প্রতীক হিসেবে উঠে না আসতেন, তবে এস কে সুর চৌধুরী হয়তো আজও অনিয়মগুলো অধরাই থেকে যেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরই যেখানে অনায়াসে নজরদারির বাইরে থেকে যান, সেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের জেনারেলে ম্যানেজার বা ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনিয়ম যে পদ্ধতিগতভাবে অলক্ষিত থেকে যাবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
  • বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি প্রয়োগ ব্যবস্থা মূলত 'ঘটনা-ভিত্তিক' , কোনো স্বয়ংক্রিয় 'নিয়ম-ভিত্তিক' কাঠামো নয়। কোনো বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়াগুলো সাধারণত নিষ্ক্রিয়ই থেকে যায়।"
  • বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের মাঠপর্যায়ে—যেমন সিনিয়র অফিসার ,প্রিন্সিপাল অফিসার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এবং শাখা ব্যবস্থাপক পর্যায়ে অপরাধমূলক প্রবণতা ও দুর্নীতির হার মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে বড় ধরণের আর্থিক কেলেঙ্কারি শীর্ষ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন ব্যাংকের একদম প্রাথমিক বা তৃণমূল পর্যায়েও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটেছে।
  • নিচে তৃণমূল পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তাদের এই "অপরাধপ্রবণ" হয়ে ওঠার মূল কারণ, ধরণ এবং এর পরিণতি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • ভুয়া ঋণ ও নথি জালিয়াতি: ঋণের আসল কাগজপত্র যাচাই না করে বা ভুয়া দলিলপত্র ও এনআইডি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অসৎ ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে সহায়তা করা।
  • অতিরিক্ত সম্পত্তি মূল্যায়ন ঋণগ্রহীতার সাথে যোগসাজশ করে কম দামি বা অস্তিত্বহীন জমি/সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে জামানত (Collateral) হিসেবে গ্রহণ করা।
  • উৎকোচ ও কমিশন লেনদেন: নির্দিষ্ট পরিমাণ পার্সেন্টেজ বা ঘুষের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অযোগ্য গ্রাহকদের ঋণ অনুমোদন করা।
  • গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ: সাধারণ আমানতকারীদের ডেপোজিট বা এফডিআর -এর টাকা ব্যাংকের মূল সিস্টেমে এন্ট্রি না দিয়ে বা ভুয়া স্লিপ তৈরি করে সরিয়ে ফেলা।

  • উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ: শীর্ষ ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পর্ষদ থেকে কাল্পনিক বা অসৎ ঋণ অনুমোদনের জন্য যখন তীব্র চাপ আসে, তখন বাধ্য হয়ে বা চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক মধ্যম ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
  • অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকগুলোর ডিপোজিট বা লোন টার্গেট পূরণের জন্য অনেক সময় সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়াই ঋণ বিতরণ করা হয়।
  • সহজে ধনী হওয়ার প্রবণতা ও বিচারহীনতা: দ্রুত অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংকিং খাতের শাস্তির ধীরগতির কারণে অপরাধীদের মনে ভয় কমে গেছে।
  • অভ্যন্তরীণ তদারকির অভাব ;ব্যাংকের ইন্টারনাল অডিট বা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা প্রায়ই স্থানীয় বা তৃণমূল পর্যায়ের দৈনিক অনিয়মগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

বিদ্যমান আইনি কাঠামো যথেষ্ট হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার ঘাটতিই প্রধান বাধা। অসাধু কর্মকর্তাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সৎ কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সৎ ব্যাংকারদের কাজের সুরক্ষা প্রদান এবং ৬ ট্রিলিয়ন টাকার খেলাপি ঋণ সংকটের জট খুলতে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী একজন সৎ ব্যক্তিত্ব; তাই শিক্ষকতা ও গবেষণা পটভূমি থেকে উঠে আসা মুদ্রা ও আর্থিক অর্থনীতিতে সুপণ্ডিত এবং স্বাধীনচেতা একজন যোগ্য অর্থশাস্ত্রবিদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া তার দায়িত্ব।

লেখক: ম্যাক্রো ও আর্থিক অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ

(ঢাকাটাইমস/১০ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বিমানের চাকা বিচ্ছিন্ন, শাহজালালে জরুরি অবতরণ
যশোরে ট্রেনের ধাক্কায় খুলনার যুবকের মৃত্যু
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপ, আটক ৩
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল আটক