স্বেচ্ছাকৃত ছুটি’ বনাম ‘বাধ্যতামূলক আইনি সুরক্ষাঃ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অভিপ্রায় ও ইসি'র অপব্যাখ্যা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ অলিন্দ—সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ—যখন কোনো চূড়ান্ত রায় বা ডিক্রি ঘোষণা করে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় তা দেশের সমগ্র নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের জন্য অলঙ্ঘনীয় আইনের রূপ পরিগ্রহ করে। সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদের এই দ্ব্যর্থহীন স্পিরিটকে পাশ কাটিয়ে যখন কোনো সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আদালতের রায়ের নিজস্ব সুবিধাজনক ও খণ্ডিত ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, তখন তা কেবল আইনের শাসনের (Rule of Law) পরিপন্থীই নয়, বরং সুশাসনের (Good Governance) মৌলিক ভিত্তিকে উপড়ে ফেলে। বিগত প্রায় এক বছর ধরে ৮৫ জন উপজেলা/থানা নির্বাচন কর্মকর্তার চাকরিতে পুনর্বহাল, জ্যেষ্ঠতা (Seniority) এবং সকল আর্থিক সুবিধা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রিভিউ রায় বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্রমাগত কালক্ষেপণ ও ফাইল চালাচালি তেমনই একটি গভীর প্রশাসনিক ও আইনি সংকটের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের মূল আপত্তির জায়গাটি দাঁড়িয়ে আছে রায়ে ব্যবহৃত একটি টেকনিক্যাল শব্দবন্ধ—"Extraordinary Leave" (অসাধারণ ছুটি)-এর ওপর। কমিশন দাবি করছে, সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী অসাধারণ ছুটিতে কোনো কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা বা বকেয়া বেতন-ভাতা পেতে পারেন না। একজন অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার গবেষক হিসেবে রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান, বিচারের নজির এবং তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে আমি মনে করি, ইসির এই আমলাতান্ত্রিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ, আইনবহির্ভূত এবং প্রকারান্তরে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের শ্রেষ্ঠত্বকে খর্ব করার একটি সুকৌশল অপপ্রয়াস যা আসলে আদালত অপমাননার চরম অপরাধ।
নির্বাচন কমিশন তাদের এই আইনি বিভ্রান্তি ও অপব্যাখ্যা জাস্টিফাই করতে সরকারি চাকরিবিধির দুটি ভিন্ন টেকনিক্যাল বিধির অপপ্রয়োগ করছে, যার সূক্ষ্ম আইনি ব্যবচ্ছেদ অনুধাবন করা সাধারণ পাঠকদের জন্য আবশ্যক। কমিশন এখানে মূলত 'Bangladesh Service Rules (BSR) Part-1' এর মূল বিধি 93 (Rule 93) এবং এর সাথে পঠিতব্য 'The Prescribed Leave Rules, 1959' এর বিধি 9(3) [Rule 9(3)]-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আইনগতভাবে, BSR Part-1 এর বিধি 93 হলো অসাধারণ ছুটির মূল সংজ্ঞা ও সাধারণ আর্থিক সীমারেখা নির্ধারণকারী ধারা, যা বলে যে অসাধারণ ছুটি চলাকালীন কোনো কর্মচারী সাধারণ নিয়মে কোনো ছুটি-ভাতা বা বেতন প্রাপ্য হবেন না। অন্যদিকে, The Prescribed Leave Rules, 1959 এর বিধি 9(3) হলো একটি মেয়াদী ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণমূলক উপ-বিধি, যা কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার চাকরি জীবনে একক মেয়াদে সর্বোচ্চ কতদিন পর্যন্ত (যেমন সর্বোচ্চ ৩ বছর বা ৫ বছর) বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা যাবে, তার সর্বোচ্চ সময়সীমার টেকনিক্যাল হিসাব ও শর্ত নির্ধারণ করে।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে মৌলিক সত্যটি গোপন করছে তা হলো—এই দুটি বিধির (Rule 93 এবং Rule 9(3)) সামগ্রিক আইনগত প্রয়োগক্ষেত্র কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন কোনো সরকারি কর্মচারী ‘স্বেচ্ছায়, স্ব-উদ্যোগে বা নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রয়োজনে’ অন্য কোনো ছুটি পাওনা না থাকায় কর্তৃপক্ষের নিকট সনির্বন্ধ আবেদন করেন এবং কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করে। একেই বলা হয় স্বেচ্ছাকৃত "অসাধারণ ছুটি"।
বিপরীতে, আলোচ্য ৮৫ জন নির্বাচন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিপরীতধর্মী। এই কর্মকর্তারা নিজস্ব প্রয়োজনে কোনো ছুটির আবেদন করেননি; বরং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদেরকে চাকুরিচ্যুত করে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল—যা পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক প্রত্যয়িত ও বেআইনি ঘোষিত হয়েছে। আপিল বিভাগ যখন এই কর্মকর্তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের পাশাপাশি "সিনিয়রিটিসহ সকল আর্থিক সুবিধা" প্রদানের সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নির্দেশ (Mandatory Direction) দিয়ে ওই মধ্যবর্তী সময়কালকে ‘Extraordinary Leave’ হিসেবে গণ্য করতে বলেছেন, তখন তা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বা সংবিধিবদ্ধ ছুটি ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি "Judicial Protection" বা বিচারবিভাগীয় সুরক্ষা।
আইনি পরিভাষায়, এই সুরক্ষামূলক অসাধারণ ছুটির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কর্মকর্তাদের চাকরিজীবনের ধারাবাহিকতা (Continuity of Service) রক্ষা করা; যেন দীর্ঘকাল বেআইনিভাবে অফিসের বাইরে থাকার কারণে তাদের চাকরিজীবনে কোনো ‘Break in Service’ বা প্রযুক্তিগত বিরতি না পড়ে এবং তাদের জ্যেষ্ঠতা বা অবসরকালীন পেনশনের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। আদালত যেখানে একই বাক্যে "সকল আর্থিক সুবিধা" প্রদানের আদেশ জারি করেছেন, সেখানে সাধারণ চাকরিবিধির Rule 93 বা Rule 9(3) এর সংকীর্ণ প্রশাসনিক সংজ্ঞা টেনে এনে আর্থিক সুবিধা আটকে দেওয়া সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।
এখানে আইনের একটি সর্বজনীন নীতি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যা হলো—Rule of Harmonious Construction বা সামগ্রিক ব্যাখ্যার নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো বিচারিক রায়ের একটি একক শব্দ বা অংশকে বিচ্ছিন্নভাবে স্বকীয় সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে রায়ের মূল উদ্দেশ্য ও অন্য কোনো প্রধান অংশকে নস্যাৎ বা অকার্যকর করা যায় না। নির্বাচন কমিশন যদি কেবল ‘Extraordinary Leave’ শব্দটিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে কর্মকর্তাদের বকেয়া বেতন ও আর্থিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তবে তা আপিল বিভাগের প্রধান নির্দেশ—অর্থাৎ "সকল আর্থিক সুবিধা প্রদানের আদেশ"–কে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও বিলুপ্ত (Infructuous) করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের কোনো সুনির্দিষ্ট আদেশকে সংকুচিত বা অকার্যকর করার কোনো আইনগত এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। এমন খণ্ডিত বা টুকরো টুকরো করে রায় মানার (Piecemeal Compliance) অপচেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের অবমাননার নজিরগুলোতে (Judicial Precedents) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি পরিষ্কারভাবে আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩ এর অধীনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
তাছাড়া, আইনের আরেকটি প্রাচীন ও সুপ্রতিষ্ঠিত ল্যাটিন নীতি হলো—“Generalia specialibus non derogant” (বিশেষ আইন বা আদেশ সাধারণ বিধিকে ওভাররাইড করে)। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR) কিংবা দ্য প্রেসক্রাইবড লিভ রুলস, ১৯৫৯ হলো সাধারণ সংবিধিবদ্ধ প্রশাসনিক প্রবিধান (Subordinate Legislation)। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রিভিউ রায় হলো সরাসরি সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদ নিঃসৃত দেশের সর্বোচ্চ বিশেষ আইনি আদেশ (Doctrine of Sovereign Override)। কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিধিমালা বা সরকারের কোনো আইন কর্মকর্তার বা দপ্তরের মতামত সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক আদেশের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে না।
একই সাথে কমন ল’-এর একটি চিরন্তন নীতি এখানে স্মরণীয়: “Commodum Ex Injuria Sua Non Habere Debet”—অর্থাৎ, কোনো পক্ষই নিজের কৃত অন্যায়ের সুফল নিজে ভোগ করতে পারে না। নির্বাচন কমিশন নিজেই এই কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করে আইন লঙ্ঘন করেছিল। এখন ইসি যদি বলে, "যেহেতু আপনারা আমাদের আদেশের কারণে অফিসের বাইরে ছিলেন, তাই চাকরিবিধি অনুযায়ী আপনাদের বকেয়া বেতন দেওয়া যাবে না"—তবে তা হবে নিজেদের ভুল ও বেআইনি কাজের ওপর ভর করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আটকে রাখার একটি অনৈতিক ও দুর্উদ্দেশ্যপ্রবণ (Malafide) প্রচেষ্টা। সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট করেছে যে, কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ নিজের ভুলের অজুহাতে নাগরিককে তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত আইনের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের ওপর আমলাতান্ত্রিক কসরত করে গত এক বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে চিঠি চালাচালি করে সময়ক্ষেপণ করা কেবল এই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং দেশের সামগ্রিক সুশাসন কাঠামোকে দুর্বল করে।
আমি নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারক মহলকে অবিলম্বে এই আইনি অবসংলগ্নতা, অস্পষ্টতার অজুহাত ও অপব্যাখ্যা পরিহার করার আহ্বান জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল আদালতের শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও পবিত্রতাকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে, ৮৫ জন কর্মকর্তার বকেয়া বেতন-ভাতা ও জ্যেষ্ঠতা সহ রায়টি অনতিবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাচ্ছি। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক সুরক্ষাকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ
(ঢাকাটাইমস/১২ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













