নবম পে-স্কেল হোক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার সূচনা

শামীম আনোয়ার
  প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০৩| আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০৬
অ- অ+

সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পে-স্কেল দেওয়ার জন্য সরকার বাহাদুরকে ধন্যবাদ। সবিশেষ কৃতজ্ঞতা নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি বেতন বাড়িয়ে বেতনবৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।

পাশাপাশি সদাশয় সরকারের কাছে আমার বিনীত আরজ- যুগযুগ ধরে দেশের বৃহদাংশ সরকারি অফিসে বিরাজমান প্রায় প্রকাশ্য অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূলে নতুন পে-স্কেল যেই সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে, দয়া করে সেটি কাজে লাগান।

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি- সরকারি চাকরিতে বেতন কম, বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাই কেউ কেউ নাকি বাধ্য হয়েই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক আছে। এখন নতুন পে-স্কেলের পর সেই অজুহাতটি তো আর থাকছে না। এখনই সময়, সেবার শপথ নিয়ে চাকরিতে ঢুকে ঘুষ-দুর্নীতিতে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনযন্ত্র থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার। শুধু চাকরি থেকে অপসারণ নয়, অপরাধের ধরন ও প্রমাণ অনুযায়ী তাদের বিচারের মুখোমুখি করাও একান্ত প্রয়োজন।

দুর্নীতিবাজদেরকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে?

অফিসে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করা কোনো রকেট সায়েন্স নয় কিন্তু। বরং কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসপাড়ার ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে, সবাই বোঝে, তবুও নানান ছুতায়, নানান বাহানায় সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিঘ্নে চলে আসছে দুর্নীতি নামের চরম সামাজিক নিপীড়ন। অবশ্য অনন্যোপায় মানুষ সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করতে শিখেও গেছে!

দুর্নীতিবাজ শনাক্ত করতে বছরের পর বছর তদন্ত প্রয়োজন?

না। অন্তত প্রাথমিকভাবে তাদের শনাক্ত করা এত কঠিন কিছু হওয়ার কথা নয়। কোনো কর্মকর্তার অধীনে কর্মরত ১০ জন অধস্তন কর্মচারীকে যথাযথ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিয়ে স্বাধীনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের কাছ থেকেও তথ্য নিন। গণমাধ্যমকেও যুক্ত করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আয়, সম্পদ, জীবনযাপন ও অভিযোগ, সবকিছু মিলিয়ে দেখুন। আমাদের এত গোয়েন্দা সংস্থা, এত তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান- তারা সবাই যদি সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তাহলে এক সপ্তাহের প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়েই অনেক চিত্র পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।

আরেকটি বহুল প্রচলিত অজুহাত আছে,

“স্যার, এই পোস্টিং পেতে এত টাকা খরচ করেছি। টাকা তুলব না?”

এবার তাদের খুব সহজ একটি প্রশ্ন করা দরকার,

“তোমাকে কে বলেছে এত টাকা দিয়ে ওই পোস্টিং নিতে? নির্দিষ্ট ওই চেয়ার না পেলে কি তোমার চাকরিটা চলে যেত?”

যে ব্যক্তি ঘুষ দিয়ে লাভজনক পোস্টিং কেনে, তারপর জনগণের কাছ থেকে ঘুষ তুলে সেই টাকা ‘উসুল’ করে, তার অপরাধ কেবল ঘুষ নেওয়া নয়; পুরো ব্যবস্থাটাকেই সে ব্যবসায় পরিণত করেছে। তাই এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আমি মাঝেমধ্যে ভাবি, টেকনিক্যাল বা আইনি কারণে দুর্নীতিবাজদেরকে একেবারে ছেঁটে ফেলা যদি সম্ভব না-ও হয়, অন্তত তাদেরকে দিয়ে যদি এই স্বীকারোক্তিটা দেওয়ানো যেত যে, তারা দুর্নীতিবাজ। নিজেদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া সাপেক্ষে তারা মাথা নিচু করে সরকারি চাকরি করুক। কিন্তু দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়বে, আবার উঁচু গলায় লেকচার ঝাড়বে, এর চেয়ে বড় অন্যায় মনে হয় না আর কিছু হতে পারে। কণ্ঠ উচ্চ থাকবে শুধু সৎ মানুষদের। মোট কথা, দুর্নীতিবাজদেরকে যদি চাকরিচ্যুত করা না-ও যায়, অন্তত তাদের মাথা নিচু করে চাকরি করতে বাধ্য করা।

বহুবার চেষ্টা করেছি ঘুষখোর- দুর্নীতিবাজদের প্রতি সহনশীল হয়ে জীবনটা পার করে দিতে। তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদে মুখ খুলে শুধু শুধু অনেক কষ্টে অর্জিত সাধের চাকরিখানাকে (এবং পৈতৃক প্রাণটাকেও) ঝুঁকিতে ফেলার কী দরকার! কিন্তু প্রায় প্রকাশ্যে দুর্নীতি করেও এই নর্দমার কীটগুলোকে (কুকুরের বা* শব্দটা বলতাম; কিন্তু মানুষের পর আমার দ্বিতীয় প্রিয় প্রাণী হলো কুকুর এবং গরু) খুব বড় বড় কথা বলতে এবং সৎ মানুষদেরকে অতি কায়ক্লেশে জীবানাতিপাত করেও মাথা নিচু করে চলাফেরা করতে দেখলে কেমন যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।

যুগযুগ ধরে প্রায় প্রকাশ্যে দুর্নীতি চলতে দেখেও রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজও যখন আশ্চর্যজনক নিস্পৃহ-নীরব, তখন মনে হয় সবাই হয়তো আশা হারিয়ে ফেলেছে, সব মেনে নেওয়ার মেকানিজম রপ্ত করে ফেলেছে। নতুন পে-স্কেল আমাদেরকে সেই হারানো আশা ফিরিয়ে আনার প্রকৃষ্ট এক সুযোগ এনে দিয়েছে।

তাই এই পে-স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর ঘোষণা হয়ে থাকার বদলে এটি হোক একটি নতুন সামাজিক ও প্রশাসনিক চুক্তির সূচনা।

সরকারি কর্মচারী বলবেন-

“আমার বেতন রাষ্ট্র দেয়, আমার দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া। ঘুষ নেওয়া-দুর্নীতি করার অধিকার আমাকে কেউ দেয়নি।”

আর রাষ্ট্র ও জনগণ বলবে-

“সৎ থাকুন, আমরা আপনার পাশে আছি।

দুর্নীতি করবেন, আইন আপনার পেছনে আছে।”

নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে এই বার্তাটিকেও যদি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা যায়, তাহলেই সেটি হবে প্রকৃত অর্থে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন, জাতীয় জীবনে নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব।

বেতন বাড়ুক। মর্যাদা বাড়ুক। সুযোগ-সুবিধা বাড়ুক। কিন্তু তার সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতাও প্রতিষ্ঠিত হোক। নতুন পে-স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর সুযোগ নয়; এটিই হয়ে উঠুক দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন সামাজিক ও প্রশাসনিক চুক্তির শুরু। এটিই পরিণত হোক নাগরিকদের সেবার শপথ নিয়ে চাকরিতে এসে দুর্নীতির মহোৎসবে লিপ্ত, দেশের প্রশাসন যন্ত্রের ওপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসা ব্যক্তিদেরকে ছেঁটে ফেলার অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণে। দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে সৃষ্ট চরম নাগরিক বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনে নতুন বন্দোবস্তের শুভ সূচনার নামান্তর হয়ে উঠুক নবম পে-স্কেল।

[ফেসবুকের মাধ্যমে যারা আমার সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাদের কারো পক্ষে যদি সম্ভব হয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমার এই বিনীত আরজটুকু পৌঁছে দিবেন। যদি সত্যিই এটি করা সম্ভব হয়, দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সীমাহীন নিপীড়নের শিকার এই দেশের মানুষ তাঁর নিকট চির কৃতজ্ঞ থাকবে, ধন্যবাদ ]।

লেখক: বিসিএস (পুলিশ), এডিশনাল স্পেশাল এসপি (সিআইডি), সিআইডি হেডকোয়ার্টার্স, মালিবাগ, ঢাকা।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4