ঈশ্বরদী ইপিজেড: রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে বদলে যাচ্ছে ঈশ্বরদীর অর্থনীতি

আবুল ফয়েজ মোঃ হাবিবুর রহমান
  প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২২
অ- অ+

পাবনার ঈশ্বরদীর পাকশীতে অবস্থিত ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (Ishwardi Export Processing Zone—IEPZ) এখন উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০০১ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই শিল্পাঞ্চলটি সময়ের সঙ্গে শুধু পোশাকশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, উইগ, তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, শিল্পকারখানার গ্লাভস, ব্যাটারি, প্লাস্টিক, জুতা, রাসায়নিক, অটোমোবাইল পার্টসসহ বহুমুখী শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ BEPZA-এর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর আয়তন ৩০৮.৯৭ একর এবং এখানে ৩২৪টি শিল্প প্লট রয়েছে। বর্তমানে অঞ্চলটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৮৬.২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানি ২.৩২৪৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কর্মসংস্থান হয়েছে ২০,৯২৯ জনের।

ভৌগোলিক অবস্থানই বড় শক্তি

ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর অন্যতম বড় সুবিধা এর কৌশলগত অবস্থান। পাকশীতে অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চলটি সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ও বন্দরের দিকে পাঠানোর ক্ষেত্রে এর বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

শিল্পাঞ্চলটির চারপাশের সবুজ পরিবেশও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রশস্ত সড়ক, বৃক্ষশোভিত এলাকা, ফুটপাত এবং পরিকল্পিত শিল্প অবকাঠামো ঈশ্বরদী ইপিজেড-কে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চল থেকে কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর একটি কারখানা Vintage Denim Studio ২০১২ সালে বাংলাদেশের প্রথম LEED Platinum Certified Green Factory হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে। এটি বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

শুধু পোশাক নয়, বহুমুখী শিল্পের কেন্দ্র

বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্প দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর হলেও ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর শিল্প কাঠামোয় পণ্যের বৈচিত্র্য দেখা যায়।

BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী এখানে তৈরি হচ্ছে রেডিমেড গার্মেন্টস, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, ডেনিম, সুয়েটার, টেন্ট ও ক্যাম্পিং পণ্য, উইগ ও হেয়ার প্রোডাক্ট, শিল্পকারখানার গ্লাভস, ক্যাপ, প্লাস্টিক পণ্য, ব্যাটারি, জুতা, সুতা, রাসায়নিক, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য, অটোমোবাইল পার্টস, লেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য।

এই বহুমুখী উৎপাদন কাঠামো ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কারণ বৈশ্বিক বাজারে কোনো একটি পণ্যের চাহিদা কমে গেলেও অন্য পণ্যের মাধ্যমে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার সুযোগ থাকে।

নতুন বিনিয়োগে বাড়ছে কর্মসংস্থান

ঈশ্বরদী ইপিজেড-এ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনা প্রতিষ্ঠান Bangladesh Haijintone Hair Products Co. Ltd. ঈশ্বরদী ইপিজেড-এ উইগ ও হেয়ার-সম্পর্কিত পণ্য উৎপাদনের জন্য ৩.৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৬.৯৮ মিলিয়ন পিস পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয় এবং প্রায় ১,৪৭৪ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা জানায়।

এর আগে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ মালিকানাধীন Oscar Bangla Co., Ltd. ঈশ্বরদী ইপিজেড-এ উইগ ও হেয়ার-সম্পর্কিত পণ্য তৈরির জন্য ৩.৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করে। ওই কারখানায় প্রায় ১,৫০০ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

২০২৫ সালের মে মাসে চীনা প্রতিষ্ঠান Qingdao Dongfang Packaging Technology Ltd. ঈশ্বরদী ইপিজেড-এ প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনের জন্য ৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করে। প্রতিষ্ঠানটি পলি ব্যাগ, হ্যাং ট্যাগ ও পেপার ট্যাগ উৎপাদন করবে এবং প্রায় ২৪০ জনের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা রয়েছে।

এসব বিনিয়োগ দেখায় যে ঈশ্বরদী ইপিজেড এখন শুধু তৈরি পোশাকের বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং নতুন নতুন পণ্য ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব

একটি ইপিজেড-এর গুরুত্ব শুধু তার রপ্তানি আয় বা কারখানার সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি বিশাল স্থানীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ২০ হাজারের বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান মানে ঈশ্বরদী ও আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার পরিবারের আয়-উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। এর পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান, বাসাবাড়ি, ভাড়া, খুচরা ব্যবসা, পণ্য পরিবহন, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংকিং, লজিস্টিকস ও বিভিন্ন সেবা খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানও তৈরি হয়।

ফলে ঈশ্বরদী ইপিজেড শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ economic ecosystem বা অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করেছে।

নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিবর্তন

রপ্তানিমুখী শিল্পের অন্যতম বড় সামাজিক অবদান হলো নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, অ্যাকসেসরিজ ও বিভিন্ন হালকা শিল্পে বিপুলসংখ্যক নারী কর্মী যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে অনেক পরিবারে নারীর নিজস্ব আয় সৃষ্টি হয়েছে, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা বেড়েছে এবং সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

BEPZA-এর ‘One Stop Service’ সুবিধা

বিনিয়োগকারীদের জন্য ইপিজেড ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধা হলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী ঈশ্বরদী ইপিজেড-এ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, কাস্টমস সুবিধা, নিরাপত্তা, ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, পরিবহন, গুদামসহ বিভিন্ন সহায়ক সেবা রয়েছে।

এ ধরনের সেবা বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ১০০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার সুযোগ, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিভিন্ন সুবিধা এবং ইপিজেড-এর জন্য নির্ধারিত আর্থিক প্রণোদনাও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখে।

রপ্তানি অর্থনীতিতে অবদান

ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর সামগ্রিক সাফল্য বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। BEPZA-এর আওতাধীন অঞ্চলগুলো FY 2024–25-এ মোট ৮.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা বাংলাদেশের মোট জাতীয় রপ্তানির ১৭.০৩ শতাংশ।

FY 2025–26-এ BEPZA-এর আওতাধীন অঞ্চলগুলোর রপ্তানি আরও বেড়ে ৮.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায় এবং জাতীয় রপ্তানিতে তাদের অবদান দাঁড়ায় ১৭.৫১ শতাংশ। এই বৃহৎ রপ্তানি কাঠামোর একটি অংশীদার হিসেবে ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কোথায়?

ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর সামনে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো শিল্পের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার।

ঈশ্বরদী ও পাবনা কৃষি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। তাই কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, খাদ্যপণ্য, কৃষিযন্ত্র, কৃষি-প্রযুক্তি, প্যাকেজিং, কোল্ড-চেইন, কৃষিপণ্যভিত্তিক রপ্তানি শিল্পসহ নতুন খাত তৈরি করা গেলে ইপিজেড-এর সঙ্গে স্থানীয় কৃষির একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI, automation, robotics, smart factory এবং Industry 4.0 প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, কাঁচামাল আমদানির ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশেষ করে ভবিষ্যতে ইপিজেড-এর প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে green production, renewable energy, energy efficiency, waste management এবং carbon reduction-এর দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

উত্তর-পশ্চিমের শিল্পায়নের সম্ভাবনার প্রতীক

ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর দিকে তাকালে বাংলাদেশের শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চোখে পড়ে। শিল্পায়ন এখন শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটছে।

একসময় যে ঈশ্বরদী মূলত কৃষি, রেলওয়ে ও ঐতিহাসিক পাকশীকে ঘিরে পরিচিত ছিল, সেই ঈশ্বরদী এখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি উৎপাদনের মানচিত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ২০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান, ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানি, নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্পের বহুমুখীকরণ সব মিলিয়ে ঈশ্বরদী ইপিজেড উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী প্রতীক।

ভবিষ্যতে যদি দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, উন্নত লজিস্টিকস এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে শিল্পের আরও কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে ঈশ্বরদী ইপিজেড শুধু পাবনা নয় সমগ্র উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস লিমিটেড

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
শিশু আছিয়া আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্টে বহাল
১১২ বছরের ঐতিহ্যবাহী রুপাপাত বামন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি গঠন
র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলারের বোয়িং কিনছে বাংলাদেশ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা