ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ডিজেল ও জ্বালানি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে: ট্রাম্প

ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে রাশিয়া তার ডিজেল ও জ্বালানি শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা এ যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ‘দুর্ভাগ্যবশত’ তাদের ডিজেল তেল শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধটি ‘হাস্যকর এবং শেষহীন’ হয়ে উঠেছে এবং এটি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
ট্রাম্পের মন্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তেল শোধনাগারে একের পর এক হামলা
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে তাদের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। রুশ ভূখণ্ডের বিভিন্ন তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার কারণে বেশ কয়েকটি স্থাপনায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ বা কমিয়ে দিতে হয়েছে।
সম্প্রতি মস্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। এসব হামলার কারণে দেশটির তেল পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি।
তবে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা কতটা কমেছে এবং এর কতটা সরাসরি ইউক্রেনীয় হামলার কারণে—এ বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে। ফলে ৪৫ শতাংশ সক্ষমতা কমে যাওয়ার দাবিটিকে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপের ভিত্তি বিবেচনায় নিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে ডিজেলের দামের ওপর প্রভাব
ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার ডিজেল অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার প্রভাব শুধু রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ছে।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির তেল শোধনাগারগুলোতে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের প্রত্যাশা ও বাণিজ্যিক প্রবাহের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নির্ধারণে শুধু রাশিয়ার পরিশোধন সক্ষমতা নয়, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ, চাহিদা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, শিপিং ব্যয় এবং অন্যান্য উৎপাদক দেশের উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জেলেনস্কিকে ট্রাম্পের আহ্বান
ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাত কমানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি খাতে হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত।
জেলেনস্কির এই বক্তব্যের অর্থ হলো, দুই পক্ষের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধের বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। তবে এমন কোনো সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
যুদ্ধের নতুন মাত্রা জ্বালানি অবকাঠামো
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাম্প্রতিক পর্যায়ে উভয় পক্ষের জ্বালানি অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানোর অভিযোগের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থায় পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের অর্থনীতি ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাত দেশটির অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় ইউক্রেনের জন্য এসব স্থাপনায় হামলা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু দেশটির অর্থনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা কতটা অব্যাহত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হয় কি না, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।
(ঢাকাটাইমস/২২ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











