রাশিয়ায় নির্বাচনে পুতিনের দলের নিরঙ্কুশ জয়

রাশিয়ার পার্লামেন্ট ডুমা-র নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিশাল জয় পেয়েছে।
শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে রোববার ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ শেষে সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করে। তবে টানা তিন দিনের এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে ক্রেমলিন বা ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচক—এমন কোনো দলেরই অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না।
রাশিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এলা পামফিলোভার দেওয়া প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ডুমার ৪৫০ আসনের মধ্যে ৩৫৫টিতেই জিতেছে ইউনাইটেড রাশিয়া। গত পঁচিশ বছর ধরে রাশিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য চালাচ্ছে এই দল।
এই জয় পুতিনের দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করল। ভেঙে দিল আগের ৩৪৩ আসনের রেকর্ড। এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্থ হলো, প্রয়োজন পড়লেই তারা সংবিধান বদলে ফেলতে পারবে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর পর এটাই রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। ক্রেমলিন বলছে, এই ফলই প্রমাণ করে, ১৯৯৯ সালের নববর্ষের প্রাক্কাল থেকে ক্ষমতায় থাকা পুতিনের পেছনেই একতাবদ্ধ হয়ে আছে পুরো রাশিয়া।
এই যুদ্ধ বহু মানুষের প্রাণ গেছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনেও এর ধাক্কা লেগেছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সামরিক অভিযানের কোনো রকম সমালোচনা নিষিদ্ধ করেছে মস্কো। এমনকি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো একমাত্র দলটিকেও নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, 'এই পরিসংখ্যানগুলো রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি রুশ সমাজের সর্বোচ্চ ঐক্যের প্রমাণ।'
পুতিনের অধীনে নির্বাচনগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই ইউনাইটেড রাশিয়ার জয় নিয়ে রাশিয়ায় কারোরই খুব একটা সন্দেহ ছিল না।
ইউক্রেনে থাকা সেনাদের সমর্থনে ভোট দেওয়ার জন্য রুশদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন পুতিন। ইউক্রেনের যেসব এলাকা মস্কোর দখলে, সেখানেও ভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
পামফিলোভা বলেন, এবার ভোট পড়েছে ৫৯ শতাংশের বেশি—যা গত এক দশকের মধ্যে যেকোনো পার্লামেন্ট নির্বাচনে সর্বোচ্চ। 'রাশিয়ার ওপর প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ' থাকা সত্ত্বেও ভোট দেওয়ায় নাগরিকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
একইসঙ্গে তিনি ইলেক্ট্রনিক ভোটিং সিস্টেমকে লক্ষ্য করে চালানো 'হাজারেরও বেশি' সাইবার হামলার নিন্দা জানিয়ে এর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেন।
পামফিলোভা আরও জানান, ইতিমধ্যে ৯৫ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে; চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হবে।
ইউক্রেন অভিযানের কারণে পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন। ভোটের শেষ দিন, রোববার মস্কোতে যুদ্ধের ব্যাপক পরিসরে ড্রোন হামলা চালায় কিয়েভ। এতে দুজন নিহত হন, একটি তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়।
মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে পামফিলোভা বলেন, 'চরম পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমরা এই নির্বাচনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সফল হয়েছি।' ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করার জন্য তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান।
এই নির্বাচনের ফল পুতিনের ক্ষমতা আরও দৃঢ় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারও কারও শঙ্কা, রাশিয়ায় নতুন করে সামরিক সেনা সমাবেশ শুরু হতে পারে। পুতিন অবশ্য এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে কিয়েভের অভিযোগ, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন করে সেনা ডাকার পরিকল্পনা করছে মস্কো।
নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। তারা পেয়েছে ৪০টি আসন। জাতীয়তাবাদী দল এলডিপিআর ২৫টি ও নিউ পিপল পার্টি পেয়েছে ২০টি আসন।
কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা যখন বেড়েছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথও যখন রুদ্ধ, সেই সময়ে অনুষ্ঠিত হলো এই নির্বাচন।
কিছু কিছু অঞ্চলে আঞ্চলিক প্রধানদের বেছে নিতেও ভোটগ্রহণ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মুসলিম অধ্যুষিত চেচনিয়ায় ৯৯.৮৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন রমজান কাদিরভ। দৃঢ় হাতে এই প্রজাতন্ত্র শাসন করার জন্য তার আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
পুতিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হয় নির্বাসনে, নয়তো কারাগারে, আর নয়তো মৃত। ২০২৪ সালে আর্কটিকের এক কারাগারে মৃত্যু হয়েছিল তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আলেক্সেই নাভালনি-র।
অধিকাংশ বিরোধী প্রার্থীকেই এবারের নির্বাচনে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল রাশিয়ার একমাত্র উদারপন্থি ও যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াবলোকো। ব্যালট থেকে তাদের পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয় এবং কেবল সিঙ্গেল-ব্যালট লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগেই বেশ কয়েকজন যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিককে কারাবন্দি করা হয়, কেউ কেউ দেশও ছাড়েন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













