ফিলিস্তিনির পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের হামলা, বাড়িঘর ও গাড়িতে আগুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪৪
অ- অ+

অধিকৃত পশ্চিম তীরের তিনটি ফিলিস্তিনি গ্রামে মঙ্গলবার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। তারা বাড়িঘর ও যানবাহনে আগুন দিয়েছে এবং কুরাইয়ুত গ্রামে এক বৃদ্ধ ফিলিস্তিনি নারীকে মারধর করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, নাবলুসের দক্ষিণে জালুদ গ্রামে তুবাসি পরিবারের দুটি বাড়িতে আগুন দেয় বসতিস্থাপনকারীরা। প্রায় দুই মাস বাস্তুচ্যুত থাকার পর ইসরায়েলি আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবারটি বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এ হামলা হয়।

স্থানীয় সূত্রগুলো তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে মঙ্গলবার এসব তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে গ্রামের বাসিন্দারা বসতিস্থাপনকারীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। আগুনে তুবাসি পরিবারের দুটি বাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ইসরায়েলি বাহিনী বসতিস্থাপনকারীদের থামানোর বদলে তাদের সুরক্ষা দেয় এবং এলাকায় অতিরিক্ত সেনা পাঠায়। পরে ইসরায়েলি বাহিনী তুবাসি পরিবারের সদস্যদের বন্দুকের মুখে আবারও বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, জালুদ এলাকায় রাতে ১০০ জনের বেশি বসতিস্থাপনকারী দাঙ্গা করেছে। সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা রাস্তা বন্ধ করে, টায়ারে আগুন দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছোড়ে। এর ফলে বাস্তুচ্যুত একটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে বাধা সৃষ্টি হয়।

দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, ‘জালুদ এলাকায় ইসরায়েলি দাঙ্গাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এবং এলাকার বাসিন্দাদের সুরক্ষা দিতে সেনা ও ইসরায়েল সীমান্ত পুলিশ বাহিনী কাজ করেছে। ওই এলাকায় একটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সমন্বয় করা হয়েছিল।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সহিংসতার কারণে পরিবারটিকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।’

তুবাসি পরিবারের বাড়ির মালিক মাহমুদ তুবাসি আনাদোলুকে বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবারটি বাড়িতে ফিরে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পায়, বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িটি দখল করে নিয়েছে এবং তাদের সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। বাড়িটিরও ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছিল। মাহমুদ তুবাসি বলেন, রাতে বসতিস্থাপনকারীরা আবার বাড়িটিতে ফিরে এসে আগুন দেয়। এতে বাড়িটি পুড়ে যায় এবং বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

বসতিস্থাপনকারীদের বারবার হয়রানি ও সহিংসতার কারণে তুবাসি পরিবারকে জুলাই মাসে জালুদের বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছিল।

পশ্চিম তীরে সহিংসতা বেড়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সহিংসতা বেড়েছে। চলতি বছর এই সহিংসতা আরও দ্রুত বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতিস্থাপনকারীদের ১ হাজার ৩৩০ টির বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ছয়টি হামলা হয়েছে। প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল এই ধরনের হামলার দ্রুততম বৃদ্ধি। বিভিন্ন বসতিস্থাপনকারী গোষ্ঠী ফিলিস্তিনিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের হামলা চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সেনারা তাদের সমর্থন বা সুরক্ষা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে গুলি চালানো, বাড়ি অবরোধ করা এবং অন্যান্য ধরনের সংঘবদ্ধ সহিংসতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এসব হামলাকে “পোগ্রোম” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মঙ্গলবার নাবলুসের দক্ষিণে কুরাইয়ুত এলাকায় আরও একটি হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে একদল ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী একটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে ঢুকে এক বৃদ্ধ নারীকে মারধর করে। স্থানীয় সূত্রগুলো আনাদোলুকে এ তথ্য জানিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মী বাশার আল-কুরাইয়ুতি ধারণ করা একটি ভিডিওতে ওই নারীকে হাত ও মাথায় আঘাতের চিহ্নসহ দেখা যায়। তিনি জানান, একদল বসতিস্থাপনকারী বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে মারধর করে।

এদিকে রামাল্লার উত্তর-পূর্বে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলের আল-মুগাইয়ির এলাকাতেও বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও সম্পত্তিতে হামলা চালায়। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা গ্রামটিতে অভিযান চালিয়ে এক তরুণকে আটক করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আনাদোলুকে জানান, হামলায় তিনটি বাড়ি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলাকারীরা এক ফিলিস্তিনি আটক ব্যক্তির মালিকানাধীন আরেকটি বাড়িতেও আগুন দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, বসতিস্থাপনকারীরা ছয়টি যানবাহনে আগুন দেয়। এর মধ্যে তিনটি আংশিকভাবে পুড়ে যায় এবং বাকি তিনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সতর্কতা আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির ইসরায়েল ও অধিকৃত ভূখণ্ড বিষয়ক প্রতিনিধি দলের প্রধান জুলিয়েন লেরিসোঁ সোমবার পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের বাড়তে থাকা সহিংসতা নিয়ে বলেন, ‘এই ঘন ঘন এবং তীব্র সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সহিংসতা থেকে জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। সেই সহিংসতা বসতিস্থাপনকারীদের কাছ থেকে এলেও এই দায়িত্ব থাকে।’ তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা এবং জনগণের প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে যে বিধান রয়েছে, তা অবশ্যই মানতে হবে।

আগস্ট মাসে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব কর্মকাণ্ড ইসরায়েলের ভাবমূর্তির গুরুতর ক্ষতি করছে।

এর আগে জুন মাসে জাতিসংঘের ১৪ জন বিশেষ প্রতিবেদক সতর্ক করে বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও সহযোগিতায় ‘বসতিস্থাপনকারীদের সন্ত্রাস’ দ্রুত বাড়ছে। তাদের মতে, এর ফলে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলো অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়েছে।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সব মজা শুধু ছেলেরাই নেবে কেন?
বিমান বহর বাড়াতে বোয়িংয়ের পর এয়ারবাসও কিনছে বাংলাদেশ সরকার
আবু সাঈদের বাড়ি ও কবরস্থান উন্নয়নে ১ কোটি টাকা দেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম
দলাদলি বন্ধ করুন, শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলুন: শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর