রাজধানীর ৪২ স্পটে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৫
অ- অ+

দেশের মাদকের ভয়াল থাবায় দিন দিন যুবসমাজের আসক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বর্তমানে দেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মাদকের বেচাকেনা হয় না। শহর থেকে শুরু করে গ্রামেও এটি সহজলভ্য। মাদক হলো একপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্য, যা ব্যবহারে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পরে। মাদক শুধু মাদকাসক্তের জন্ম দেয় না, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের বিষবাষ্প ছড়ায়। দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ, আফিম, হিরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ, এমনকি জুতার আঠাও রয়েছে। এখন এসব ভয়ানক নেশা জাতীয় দ্রব্য কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজধানীর অন্তত ৪২টি স্পটে প্রকাশ্যেই চলছে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, ভাসানটেক পুনর্বাসন কেন্দ্র ও সবুজবাগের বাগপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে এসব এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট দলে কিশোরদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে তারা পথচারীদের কাছে গিয়ে ইয়াবা বিক্রির প্রস্তাব দেয়। মাদক বিক্রেতারা ইয়াবাকে ‘পিংক ট্যাবলেট’ বা ‘গুটি’ নামে উল্লেখ করে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ক্যাম্পার বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প নিয়েও। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব এলাকায় অলিগলিতে মাদক বিক্রি হয় এবং বড় ধরনের অভিযান ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে সেখানে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

পল্লবী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর জাহান বলেন, ছোট ছোট ক্যাম্পগুলোর অলিগলিতে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হয়। তার দায়িত্বকালে ব্লক রেইডসহ বিভিন্ন অভিযানে কয়েক হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

মিরপুরের প্যারিস রোডের পরিত্যক্ত একটি ভবন স্থানীয়দের কাছে ‘ভূতুড়ে মার্কেট’ নামে পরিচিত। প্রায় ২৮ বছর ধরে পরিত্যক্ত ভবনটিতে মাদকের আড্ডা বসার অভিযোগ রয়েছে। ভবনটির পশ্চিম পাশে কমিউনিটি পুলিশের কার্যালয় থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে দিনের বেলাতেও মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়। আশপাশে ফেনসিডিলের খালি বোতলও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ওই ভবন থেকে মাদক-সংশ্লিষ্ট বিরোধের ঘটনায় আটটির বেশি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াবাসহ অ্যামফিটামিন-জাতীয় উদ্দীপক (এটিএস) ট্যাবলেট জব্দ করেছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিস। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জব্দের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে জব্দ হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ পিস।

ডিএনসি সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দিন বলেন, ইয়াবার সরবরাহ ও চাহিদা বাড়ার কারণেই জব্দের পরিমাণও বেড়েছে। রাজধানীর যেসব স্থানে অবাধে মাদক কেনাবেচা চলছে, সেসব এলাকার সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি গডফাদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে রাজধানীর ভাসানটেক পুনর্বাসন কেন্দ্র, দক্ষিণ বেগুনবাড়ী, মিরপুর-১-এর গোড়ারঘাট ও মিরপুর-১২-এর সিরামিক গেট এলাকাতেও মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাসানটেক সরকারি কলেজের পেছনে একটি অসম্পূর্ণ ভবনের কাছে এক তরুণ প্রতিবেদকের কাছে ইয়াবা বিক্রির প্রস্তাব দেয় বলে জানা গেছে।

ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (গোয়েন্দা) মেহেদী হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযান বাড়ানোর ফলে বেশি চালান শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক চোরাচালানের পুরো চিত্র জব্দের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ প্রবেশের পাশাপাশি উপকূলীয় ও নদীপথসহ বিভিন্ন বিকল্প রুটও ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদক পাচার, ব্যবসা ও সেবন ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ী পর্যন্ত সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে মাদক সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার না করে মাদকের উৎস, পরিবহনকারী, সরবরাহকারী ও মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে রাজধানীতে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।

(ঢাকাটাইমস/৫ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিনের জামিন
রাজবাড়ীতে মেয়েকে ধর্ষণের মামলায় বাবার যাবজ্জীবন 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ
নতুন দায়িত্বে আসিফ, সারজিস ও মিতু