‘সড়ক নিরাপত্ত আইন' কেন জরুরী?

তরিকুল ইসলাম
  প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫| আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৬
অ- অ+

প্রতি বছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—সড়কে মানুষের জীবন রক্ষায় আমরা কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পেরেছি? সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দেশের অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু সেই সড়কেই যদি প্রতিদিন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, পরিবার নিঃস্ব হয় এবং অসংখ্য মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হন, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। সড়ক নিরাপত্তা তাই কেবল পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৯২ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অসতর্কতার ফল নয়; এটি এমন একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট, যা প্রতিরোধে কার্যকর আইন, নিরাপদ অবকাঠামো এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে, একই বছরে বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪ জন। এই বড় পার্থক্য দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, প্রতিবেদন এবং পরিসংখ্যানের সমন্বয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও স্বচ্ছ দুর্ঘটনার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হয় না; প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়। সড়কের নকশা ও নির্মাণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের যোগ্যতা, মানসম্মত হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—প্রতিটি ক্ষেত্রকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণ ও বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা। ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও মোড় সংস্কার, নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপারের ব্যবস্থা, স্কুল ও হাসপাতাল এলাকায় উপযুক্ত গতিসীমা, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার এবং সব যাত্রীর সিটবেল্ট নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালকের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ বা নিরাপদ সড়কব্যবস্থার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে; কিন্তু সেই ভুলের কারণে যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত অনিবার্য না হয়ে ওঠে, সে জন্য পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করে গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ গতি, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা—এই পাঁচটি স্তম্ভের সমন্বয় ছাড়া টেকসই ফল অর্জন সম্ভব নয়।

সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দায়িত্বের বিভাজন ও সমন্বয়ের ঘাটতি। সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকের লাইসেন্স, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং জরুরি চিকিৎসা—এসব দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে বিভক্ত। ফলে সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে আইনগত ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন, কার্যকরভাবে স্বাধীন একটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়ন তদারকি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিতকরণ, নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতি মূল্যায়ন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাজেট, দক্ষ জনবল, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং সুস্পষ্ট জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্তৃপক্ষটি যেন কোনো একটি সংস্থার প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় আটকে না থাকে, সে জন্য এর ক্ষমতা ও স্বাধীনতা আইনেই স্পষ্ট করা জরুরি।

জাতিসংঘ ২০২১–২০৩০ সময়কালকে সড়ক নিরাপত্তার দ্বিতীয় দশক হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ দশকের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনাও নিরাপদ সড়ক, যানবাহন, গতি, সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসাসেবার ওপর সমন্বিত গুরুত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং স্বাধীন মূল্যায়ন। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তথ্য পুলিশ, হাসপাতাল, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে একই ধরনের দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তায় গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, গবেষক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, চালক, যাত্রী ও তরুণদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং ঝুঁকি প্রতিরোধের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে না নেওয়া। প্রতিটি প্রাণহানির তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে, প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ করতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক নিরাপত্তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ডে পরিণত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ, বিচার ও শোক প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই প্রাণহানি প্রতিরোধে বিনিয়োগ করতে হবে। একটি সমন্বিত, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক সড়ক নিরাপত্তা আইন এবং ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগই পারে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে তাই আমার দাবি স্পষ্ট—সড়কে প্রাণহানি কমাতে চাই শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিরোধব্যবস্থা।

লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), রোড সেফটি প্রকল্প, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। মোবাইল: ০১৭১৫২৬১৮২৭

(ঢাকাটাইমস/২২ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দল নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী: কথায় নয়, কাজেই প্রমাণ দিচ্ছেন তারেক রহমান
খুলনার দাকোপে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, জানালেন নিজেই
ইউনিসেফের চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ, মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২