দল নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী: কথায় নয়, কাজেই প্রমাণ দিচ্ছেন তারেক রহমান

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
  প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৮
অ- অ+

রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কেবল ক্ষমতা লাভ নয়; বরং ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন ও পরিমিতিবোধ। একজন রাজনৈতিক নেতা কোনো দলের প্রধান হতে পারেন, কিন্তু যখন তিনি সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর সাংবিধানিক ও নৈতিক পরিধি প্রসারিত হয়ে সমগ্র জাতির অভিভাবকে রূপান্তরিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শাসনভঙ্গি, নীতি নির্ধারণ ও প্রায়োগিক পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিভাত হয়—তিনি নিজেকে কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বস্তরের নাগরিকের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর নীতি ও কর্মতৎপরতায় এই রূপান্তরের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্র ও দলের অবিভাজ্য পার্থক্য: সুশাসনের তাত্ত্বিক ভিত্তি

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে বহু আগেই উল্লেখ করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল বেঁচে থাকা বা টিকে থাকা নয়, বরং সুনাগরিকের সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। এই চিরায়ত উপলব্ধিই আধুনিক সুশাসনের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্র কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর পৈতৃক সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র হলো সব নাগরিকের সমান অধিকার, মৌলিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সম্মিলিত কাঠামো।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই সার্বজনীন নীতিটির ওপর বারবার জোর দিচ্ছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, নির্বাচনে বিএনপিকে যারা ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি কিংবা যারা কোনো পক্ষকেই ভোট দেননি—রাষ্ট্রীয় পরিসরে এই সরকারের কাছে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান ও অভিন্ন। সম্প্রতি রাজশাহীতে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশা কিংবা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক সৌজন্যতা নয়; বরং এটি একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনের অপরিহার্য নৈতিক মানদণ্ড।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, উন্নয়ন মানে কেবল স্থূল দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি-র প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের সক্ষমতার বহুমুখী বিস্তার। একটি রাষ্ট্র তখনই সফল ও জনকল্যাণমুখী বলে বিবেচিত হয়, যখন প্রান্তিক ও দরিদ্রতম মানুষটিও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনি নিরাপত্তা এবং সুযোগের সমতা লাভ করে। এ নিরিখে বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ এবং নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রকে জনবিচ্ছিন্ন না রেখে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের বিশ্বস্ত সহযাত্রী করে তুলছে।

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন: প্রশাসনিক জবাবদিহিতা

রাজনীতিতে সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু তার কঠোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ। ইতালীয় রাষ্ট্রচিন্তক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ক্ষমতার কৌশল কিংবা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে রাজনীতি হলো ‘ধীরে ধীরে কঠিন বোর্ডে ভারী পাথর টেনে নেওয়া’র মতো এক সাধনা। অর্থাৎ, প্রকৃত নেতৃত্ব মানে কেবল জনসমুদ্রে আবেগ তৈরি করা নয়, বরং সুদীর্ঘ ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী দূরদৃষ্টি এবং আপসহীন নৈতিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রারম্ভেই বর্তমান সরকার তিনটি মূল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছিল:

  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ
  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন স্বাভাবিকতা রক্ষা

এগুলো কেবল রুটিনমাফিক প্রশাসনিক এজেন্ডা নয়; বরং সাধারণ মানুষের দৈনিক বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, অসাধু মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ অবস্থান এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপগুলো সময়েরই দাবি ছিল। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কাঠামোগত উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারের কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছানোর পাইলট প্রকল্পগুলো সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও দৃশ্যমান অগ্রগতি।

মানবিক শাসনের দর্শন ও প্রান্তিক সম্পৃক্ততা

সুশাসনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাপকাঠি হলো রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও নীতিগুলো সমাজের শেষ মানুষটির দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে কিনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, রংপুর অঞ্চলের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে গ্রামীণ অবকাঠামো জোরদার করার পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে উন্নয়ন আজ আর ঢাকাকেন্দ্রিক বা রাজধানীকেন্দ্রিক নয়।

স্বাস্থ্যখাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর দিকনির্দেশনাগুলো আরও বেশি সুদূরপ্রসারী। আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশেষায়িত শিশু ও নারী ওয়ার্ড এবং কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালিসিস সেবা চালুর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা এসেছে। মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণাপত্রের আলোকে স্বাস্থ্য কেবল কোনো সাধারণ সেবা নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ প্রকারান্তরে সামাজিক ন্যায়বিচারেরই শক্তিশালী বিস্তার।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন

বাংলাদেশ আবহমানকাল ধরে একটি বহুমাত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের ও জাতির মানুষ এখানে যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছেন। তাই রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান নৈতিক দায়িত্ব হলো যেকোনোমূল্যে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং প্রতিটি নাগরিকের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ধর্ম যার যার, দেশ সবার।” এই সর্বজনীন দর্শন জাতীয় ঐক্যকে সুসংহত করে। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, একটি সফল ও টেকসই রাষ্ট্রের তিনটি মূল স্তম্ভ হলো—কার্যকর রাষ্ট্রক্ষমতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব বা জবরদস্তি নয়, বরং চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে কেবল আইনের শাসন। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় বা প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নজিরবিহীন ও কঠোর সাংগঠনিক নির্দেশনা তারই প্রমাণ দেয়।

সমাপনী মূল্যায়ন: কাজের মধ্য দিয়েই ইতিহাসের বিচার

ইতিহাস কোনো রাষ্ট্রনায়ককে কেবল তাঁর আলংকারিক পদবি দিয়ে স্মরণ করে না; ইতিহাস মনে রাখে তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সততা এবং কাজের সুদূরপ্রসারী ফলাফল দিয়ে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বর্তমানটি সৃষ্টি করা।” বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সুশাসন একসঙ্গে পরীক্ষিত হচ্ছে।

তারেক রহমানের শাসনামলের প্রাথমিক পর্যায়টি বিচার করলে দেখা যায়, তিনি কেবল কথার বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রায়োগিক কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে আত্মপ্রকাশের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, তা আগামী দিনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে—এটাই সচেতন দেশবাসীর প্রদীপ্ত প্রত্যাশা।

লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ

(ঢাকাটাইমস/২২ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫৩৪, মামলা ৩৭
দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দামে পতন
খুলনার দাকোপে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, জানালেন নিজেই