নফস কী, কোরআনে কী বলা হয়েছে? প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের উপায়

ইসলাম ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮
অ- অ+

মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ও নৈতিক চরিত্র গঠনে ইসলামে নফসের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের অন্তরের প্রবৃত্তি কখনো তাকে পাপ ও অন্যায়ের দিকে প্ররোচিত করে, আবার আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে সেই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই ইসলামি জীবনদর্শনে নফসকে চেনা, পরিশুদ্ধ করা এবং সৎপথে পরিচালিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরবি ‘নফস’ শব্দের অর্থ প্রাণ, সত্তা, আত্মা বা ব্যক্তি। আরবি ভাষার অভিধান লিসানুল আরবে নফসকে প্রাণ ও সত্তা অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলামি আলোচনায় মানুষের সত্তা, অন্তর্গত প্রবৃত্তি এবং নৈতিক অবস্থার প্রসঙ্গেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

নফসের প্রবণতা সব সময় এক রকম থাকে না। কখনো মানুষ নিজের কামনা-বাসনার কাছে পরাজিত হয়, কখনো অন্যায় করার পর অনুশোচনা অনুভব করে, আবার কখনো আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি খুঁজে পায়। কোরআনে নফসের বিভিন্ন অবস্থার বর্ণনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

নফস সম্পর্কে কোরআন কী বলে?

পবিত্র কোরআনের সুরা আশ-শামসের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি নফসকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং তাকে পাপ ও তাকওয়ার পথ সম্পর্কে অবহিত করেছেন।

এ আয়াতের আলোকে মানুষ নিজের মধ্যে ভালো ও মন্দের প্রবণতা অনুভব করতে পারে। তার সামনে থাকে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে, সুরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষের নফস মন্দ কাজের প্রতি প্ররোচিত করতে পারে। এ কারণে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা জরুরি।

নফসের বিভিন্ন স্তর

ইসলামি আধ্যাত্মিক আলোচনায় নফসের বিভিন্ন অবস্থা বা স্তরের কথা বলা হয়। সুফি-সাধনার কিছু ধারায় এগুলোকে সাতটি স্তরে ব্যাখ্যা করা হয়। এর মধ্যে বহুল আলোচিত চারটি হলো—

১. নফসে আম্মারা: যে নফস মানুষকে মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করে। লোভ, কামনা, অহংকার ও অন্যায় আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করলে মানুষ নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে এ ধরনের প্রবণতার উল্লেখ রয়েছে।

২. নফসে লাওয়ামা: যে নফস অন্যায় করার পর নিজেকে তিরস্কার করে এবং অনুশোচনা অনুভব করে। সুরা আল-কিয়ামাহর ২ নম্বর আয়াতে ‘নফসে লাওয়ামা’র শপথ করা হয়েছে। আত্মসমালোচনা মানুষকে ভুল সংশোধন ও তাওবার পথে ফিরতে সাহায্য করতে পারে।

৩. নফসে মুলহিমা: আত্মিক আলোচনায় এ ধারণাটি এমন নফসের অবস্থাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে মানুষ ভালো-মন্দের উপলব্ধি এবং সৎকাজের প্রতি অনুপ্রেরণাকে গুরুত্ব দেয়। সুরা আশ-শামসের ৮ নম্বর আয়াতে নফসকে পাপ ও তাকওয়ার উপলব্ধি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

৪. নফসে মুতমাইন্না: প্রশান্ত ও স্থির নফস। সুরা আল-ফজরের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতে প্রশান্ত নফসকে তার রবের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

কিছু সুফি ধারায় নফসের সাতটি স্তর হিসেবে আম্মারা, লাওয়ামা, মুলহিমা, মুতমাইন্না, রাদিয়া, মারদিয়া ও কামেলার কথা বলা হয়। তবে এগুলোর রং, নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থান কিংবা প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক মর্যাদার সম্পর্ককে কোরআনের সরাসরি বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

নফসকে নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে?

নফসের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা নয়; বরং তা সংযত রাখা এবং ন্যায় ও আল্লাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

১. রোজা ও সংযম: রোজা মানুষকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও অন্যান্য বৈধ চাহিদা নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করায়। এর মাধ্যমে আত্মসংযমের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।

২. ইবাদত ও রাতের নামাজ: নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও তাহাজ্জুদ আত্মিক উন্নতি এবং আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

৩. কথা ও আচরণে সতর্কতা: মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, অহংকার ও অন্যের প্রতি বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৪. জিকির ও তাওবা: আল্লাহর জিকির, নিজের ভুল স্বীকার এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করার মাধ্যমে মানুষ মন্দ অভ্যাস পরিত্যাগের চেষ্টা করতে পারে।

৫. সৎ মানুষের সঙ্গ: সৎ, জ্ঞানী ও নৈতিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষের সাহচর্য ভালো কাজে উৎসাহিত করতে পারে। ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নফসকে শত্রু নয়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রবৃত্তি হিসেবে দেখা

নফস নিয়ে সুফি-সাধনার আলোচনায় একটি উপমা প্রচলিত আছে—নফস লাগামহীন ঘোড়ার মতো। তাকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মানুষ ভুল পথে যেতে পারে; আর সংযম ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে সে নিজের লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যেতে পারে।

তবে ‘নফসই শয়তান, নফসই আল্লাহ’—এ ধরনের বক্তব্যকে ইসলামের আকিদাগত শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। নফস মানুষের সত্তা ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা; আর আল্লাহ সৃষ্টির স্রষ্টা, যিনি সৃষ্টির কোনো কিছুর সমতুল্য নন।

একইভাবে, ‘নফসকে চিনলে রবকে চেনা যায়’—বাক্যটি সুফি-আধ্যাত্মিক আলোচনায় বহুল প্রচলিত হলেও এটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

কোরআনে প্রশান্ত নফসের আহ্বান

সুরা আল-ফজরের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে প্রশান্ত নফস! তুমি তোমার রবের দিকে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’

এই আয়াত আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং প্রশান্তচিত্তে তাঁর দিকে ফিরে যাওয়ার এক গভীর বার্তা বহন করে। মানুষের জন্য মূল শিক্ষা হলো—নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা, ভুল হলে তাওবা করা এবং সৎকাজে অবিচল থাকার চেষ্টা করা।

নফসের সঙ্গে এই নৈতিক সংগ্রাম এক দিনের নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আত্মসমালোচনা, সংযম ও আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণের মধ্য দিয়ে তা অব্যাহত থাকে।

নফস সম্পর্কে হাদিসের শিক্ষা

নফসের পরিশুদ্ধি ও আত্মসংযমের গুরুত্ব রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া ও শিক্ষায়ও প্রতিফলিত হয়েছে।

একটি দোয়ায় তিনি বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার নফসকে তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই তাকে সর্বোত্তমভাবে পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও প্রভু।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২)

এই দোয়ায় নফসের পরিশুদ্ধি, আল্লাহভীতি এবং আত্মিক উন্নতির জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার শিক্ষা রয়েছে।

ইসলামে আত্মসংযমের অর্থ কেবল বাহ্যিকভাবে পাপ থেকে দূরে থাকা নয়; বরং অন্তরের অহংকার, হিংসা, লোভ ও অসৎ আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও এর অন্তর্ভুক্ত। নিয়মিত ইবাদত, তওবা, জিকির এবং নিজের কাজের হিসাব নেওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেন।

নফস সম্পর্কে ইসলামি মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামি চিন্তাধারায় নফসের প্রশিক্ষণ ও আত্মশুদ্ধি নিয়ে বহু আলেম আলোচনা করেছেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থে মানুষের অন্তর, প্রবৃত্তি এবং নৈতিক চরিত্রের পরিশুদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর আলোচনায় প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নৈতিক গুণাবলি অর্জনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

একইভাবে ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তাঁর মাদারিজুস সালিকিন গ্রন্থে আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়া এবং অন্তরের বিভিন্ন অবস্থার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের আলোচনার মূল শিক্ষা হলো, নিজের প্রবৃত্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধনের চেষ্টা করা আত্মিক উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বর্তমান জীবনে নফস নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব

আধুনিক জীবনে ভোগবিলাস, অর্থ, খ্যাতি ও সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা মানুষের ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরি করে। বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও অনেক সময় মানুষের ভোগের ইচ্ছা বাড়িয়ে দেয়। এসব আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে আত্মসংযম ও নৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন।

নফস নিয়ন্ত্রণের অর্থ মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা নয়; বরং বৈধ চাহিদা পূরণ করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায় আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ না করা।

আত্মশুদ্ধির জন্য নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, রোজা, তওবা এবং সৎ মানুষের সাহচর্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া এবং লোভ-অহংকার থেকে দূরে থাকার চর্চাও প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে সুরা আশ-শামসের ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।’

নফসের পরিশুদ্ধিই আত্মিক উন্নতির পথ

নফস মানুষের সত্তা ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর বিভিন্ন অবস্থার আলোচনা মানুষকে নিজের দুর্বলতা বুঝতে, ভুল থেকে ফিরে আসতে এবং নৈতিক জীবন গঠনে উৎসাহিত করে।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আত্মশুদ্ধি কোনো এক দিনের কাজ নয়। বরং নিয়মিত আত্মসমালোচনা, আল্লাহর স্মরণ, তওবা ও সৎকাজের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত করে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করাই নফসের পরিশুদ্ধি এবং আত্মিক উন্নতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

(ঢাকাটাইমস/২২ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
খুলনার দাকোপে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, জানালেন নিজেই
‘সড়ক নিরাপত্ত আইন' কেন জরুরী?
ইউনিসেফের চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ, মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২