বিশ্ব এইডস দিবস
অপমান-নিগ্রহের ভয়ে মুখ লুকাতে হয় তাদের

এইচআইভি ভাইরাস বা এইডস রোগে আক্রান্তদের এখনো একঘরে করে রাখা হচ্ছে বাংলাদেশে। এমনকি চিকিৎসা নিতে গিয়েও ক্ষেত্রবিশেষে বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কারের কারণে দেশে এখনো এ রোগে আক্রান্তদেরই দায়ী করা হয়।
সামাজিকভাবে অপমান আর নিগ্রহের পাশাপাশি পরিবারেও অবাঞ্চিত হয়ে পড়েন তারা। তবে বৈষম্যমূলক আচরণের পরিবর্তে যথোপযুক্ত চিকিৎসা পেলে এ রোগে আক্রান্তরাও অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এমন বাস্তবতা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালন করা হবে বিশ্ব এইডস দিবস। এইডসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ব সম্প্রদায় ১৯৮৮ সাল থেকে ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালন করে আসছে।
এবছর বিশ্ব এইডস দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- ‘সারা বিশ্বের ঐক্য, এইডস প্রতিরোধে সবাই নিব দায়িত্ব।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এ দিবস উপলক্ষে আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
ইউএনএইডসের গবেষনায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতিদিন সাড়ে ৫ হাজার মানুষ নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ৫শ’ জনেরই বয়স ১৫ বছরের নিচে। আক্রান্ত ৩২ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের নিচে, যার ২০ ভাগই নারী। আক্রান্তদের ৬১ ভাগ সাব-সাহারা আফ্রিকান অঞ্চলে বসবাসকারী।
জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে মোট এইডস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ৩৬ দশমিক ২ মিলিয়ন। মোট আক্রান্তের ১৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন নারী এবং ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন শিশু।
অন্যদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। এসব রোগীর মধ্যে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়ে চিকিৎসার আওতায় এসেছে মাত্র ৬ হাজার ৬০৬ জন।
এইডস বিশ্বে মরণব্যধি হিসেবে পরিচিত। প্রায় সব দেশেই এ রোগে আক্রান্তদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা হয়। এমনকি আক্রান্তের পরিবারকেও সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। ফলে সংক্রমিত হয়েও অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে নিজেকে চিকিৎসা থেকে দূরে রাখেন।
এমনই একজন রাইসা খানম (ছদ্মনাম)। তার শরীরে এইডস ধরার পর তাকে ছাড়তে হয়েছে নিজ এলাকা। এমনকি তার পরিবারকে এড়িয়ে চলত সমাজের লোকজন। তিনি এখন নিজের রোগের কথা গোপন করে অন্য এলাকায় গিয়ে বসবাস করছেন। অথচ তার এ রোগটির জন্য তিনি নিজে দায়ী নন। প্রবাসী স্বামীর কারনেই এই রোগটি বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। স্বামী দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেছেন এবং সেখান থেকেই তিনি এই রোগটি বয়ে আনেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।
রাইসার মতো এইডস আক্রান্ত অনেক রোগী আছেন যাদের ভীষণভাবে অবহেলিত হয়। চিকিৎসা নেওয়া দূরে থাক, লজ্জায় এই রোগের কথা স্বীকার করতেই চায়না কেউ। ফলে চিকিৎসার অভাবে অকালেই মারা যায় অনেক রোগী। আবার অনেকেই পরীক্ষা না করানোর কারনে জানতেই পারেন না তাদের শরীরে এই ভয়াবহ ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। এইডস এর কথা জানাজানি হলেই সামাজিক নিগ্রহের ভয়ে তারা চিকিৎসা নেন গোপনে। এমনকি কেউ কেউ অন্য কোথাও গিয়ে বসবাস করতেও বাধ্য হন।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১২টি সরকারী হাসপাতালে এইডস রোগ সনাক্তকরন, চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরন করা হয়। এছাড়া কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যারা এইডস রোগীদের সনাক্তকরন, চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এবং অন্যান্য সামাজিক শক্তি ও সংগঠন সমন্বিত উদ্যোগ নিলে আর এইডস রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা, আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক নিগ্রহ ও বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশে এইডস সম্পৃক্ত মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
(ঢাকাটাইমস/০১ডিসেম্বর/ডিএম)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













