গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান

গুজব, মিথ্যা তথ্য ও পরিকল্পিত অপপ্রচার মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রস্তুতি, তথ্য যাচাই এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, পরিকল্পিত অপতথ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমানোর পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা দুর্বল করতে পারে।
শনিবার রাজধানীর হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইএনএসএস) আয়োজনে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য: জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি’ শীর্ষক নীতি সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) বিশিষ্ট অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমিনুল করিম (অব.)। সেমিনারের আহ্বায়ক ছিলেন বিআইএনএসএসের সদস্যসচিব মেজর (অব.) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু প্রচলিত সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক কৌশল এবং প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযান ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জনগণের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, তথ্যের আংশিক উপস্থাপনও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমা ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সংস্কার না হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেই শর্ত যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একইভাবে, এক কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে এর পেছনে পতিত সরকারের শাসনামলের ভূমিকা উল্লেখ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান
আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরন মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধান অতিথি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে বিশেষ মহড়ার আয়োজন করা গেলে অপতথ্য ও পরিকল্পিত প্রচারণা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতো। এখন আর সময় নষ্ট না করে কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কৌশলগত পর্যায়ে ‘পিপলস ওয়ার ডকট্রিন’ বা জনযুদ্ধের মতবাদ নিয়ে কাজ করতে হবে। পরিচালনাগত পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা এবং মাঠপর্যায়ে যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরন অনুযায়ী কৌশল ও কার্যপদ্ধতি হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
এ জন্য সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ জরুরি
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমিনুল করিম (অব.) বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব ও অপপ্রচার থেকে মুক্ত রেখে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ দেওয়া যাবে না। একটি পেশাদার সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে থেকে রাষ্ট্রের সেবা করে। বাংলাদেশেও এ ঐতিহ্য বজায় রাখতে হবে।
জাতীয় শক্তি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, কূটনীতি ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত শক্তি একটি দেশের সামগ্রিক সক্ষমতার ভিত্তি। জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা, বিভক্তি এড়িয়ে চলা এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব রক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এ সময় ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সংস্কৃতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
অপতথ্যের জবাব দিতে হবে সংগঠিতভাবে
সেমিনারে ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডির গবেষণা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ (অব.) বলেন, মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমানো এবং জাতীয় ঐক্য দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তনকালীন পরিস্থিতিতে এ ধরনের অপতথ্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা ভুল তথ্য। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে তথ্য বিকৃত করে প্রচার করাই অপতথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিশেষ ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ যাচাই ছাড়াই অন্যের প্রচার করা তথ্য ছড়িয়ে দেন, যা একপর্যায়ে সংগঠিত প্রচারণার রূপ নেয়।
অপতথ্য মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, অপতথ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধে নিবেদিত দল বা প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, সংগঠিত অপতথ্য প্রচারণার জবাবও সংগঠিতভাবে দিতে হবে। অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করতে হবে।
ভুয়া ভিডিও শনাক্তে জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
সেমিনারের বক্তারা বলেন, জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁদের আশঙ্কা। সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে এ ধরনের প্রচারণা সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
তাঁরা বলেন, মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুয়া ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
সেমিনারে এমআইএএসটি অ্যান্ড এআইবিএ, সাভারের অ্যাডজাঙ্ক্ট অধ্যাপক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো বেশি কার্যকর। অপতথ্য প্রতিরোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সেমিনারে জাতীয় নিরাপত্তা, সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে মিথ্যা ও অপতথ্য, জনআস্থা এবং সংকটকালে তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল যোগাযোগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













