কঙ্গোতে বাড়ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস ইবোলার সংক্রমণ, আরেক মহামারির ঝুঁকিতে বিশ্ব

মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডি আর) কঙ্গো এবং উগান্ডায় প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত অঙ্গসংগঠন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। কঙ্গোতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে গত কয়েক দিনে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রবিবার ডব্লিউএইচও’র প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গত এক মাসে কঙ্গোতে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ৮০ জন মারা গেছেন। এছাড়া দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ইবোলার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন ২৪৬ জন রোগী। তাদের মধ্যে আটজনের শরীরে পরীক্ষাগারে ইবোলা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এ পর্যন্ত ভাইরাসটির ছয়টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে— জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি। ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়েছে ‘জাইর’ প্রজাতি। তবে কঙ্গো ও উগান্ডায় বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসটি ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির বলে জানা গেছে।
ইবোলা মূলত মানুষ এবং প্রাইমেট গোত্রীয় প্রাণী যেমন শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটাংয়ের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্র কিংবা অন্যান্য শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, সুঁই কিংবা মৃতদেহের সংস্পর্শ থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া বনমানুষ, হরিণ ও সজারুর মাধ্যমেও ভাইরাসটি মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইবোলার সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে— হঠাৎ তীব্র জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, ত্বকে ফুসকুড়ি, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং শেষ পর্যায়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে রক্তক্ষরণ।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত না হওয়ায় ইবোলা তুলনামূলক কম সংক্রামক হলেও এর মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। গড়ে ইবোলায় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে কঙ্গোতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এই হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব এখন এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আসলে কতটা ছড়িয়েছে, তা নিয়ে এখনো একধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সাধারণত ইবোলার প্রাদুর্ভাব ছোট আকারের হয়ে থাকে। তবে ২০১৪-১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার ইতিহাসের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের স্মৃতি এখনো বিশেষজ্ঞদের তাড়া করে বেড়ায়। সে সময় প্রায় ২৮ হাজার ৬০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলা প্রাদুর্ভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও, বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন যে, এটি কোভিড-১৯-এর মতো বিশ্বব্যাপী মহামারির রূপ নেবে না। বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসের বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময়েও যুক্তরাজ্যে মাত্র তিনজন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারা সবাই ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সাইন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারির ঝুঁকি না থাকলেও, এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।
তবে কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডার জন্য বড় ঝুঁকি রয়েছে। ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে উগান্ডায় এরই মধ্যে দুজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একজন মারা গেছেন।
ইবোলা মূলত বাদুড় বা আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। কঙ্গোর বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ঘটছে ইবোলার বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির কারণে। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে মাত্র দুবার এই প্রজাতির দেখা মিলেছিল, যেখানে আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশ মারা যান।
বুন্দিবুগিও প্রজাতিটি মোকাবিলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অন্যান্য প্রজাতির মতো এর কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। এমনকি সাধারণ ইবোলা পরীক্ষার কিটগুলো এর ক্ষেত্রে ঠিকঠাক কাজ করে না। কঙ্গোতেও প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো নেতিবাচক এসেছিল। পরে উন্নত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর বুন্দিবুগিও প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং বলেন, বুন্দিবুগিও প্রজাতিটি সামলানোই এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সংক্রমিত হওয়ার ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে ইবোলার লক্ষণ দেখা দেয়। শুরুতে ফ্লুর মতো জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিলেও ধীরে ধীরে বমি, ডায়রিয়া এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। কোনো কোনো রোগীর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তপাতও হয়। নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের তরল খাবার, পুষ্টি ও ব্যথানাশক সেবার (সাপোর্টিভ কেয়ার) মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশন, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতাল ও দাফন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কঙ্গোর যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে, যেখানে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, সেখানে এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। আক্রান্ত অঞ্চলের অনেকগুলোই খনি এলাকা, যেখানে মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
(ঢাকাটাইমস/১৮ মে/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













