গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করলে জনগণকে অপমান করা হবে: জামায়াত আমির

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অধিকার কারও নেই বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা মানে জনগণকে অপমান করা। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে দেওয়া রায় বাস্তবায়নের দাবিসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বগুড়া সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দেওয়া ওয়াদা তারা ভুলে গেলেন। জনগণের সঙ্গে দেওয়া ওয়াদা তারা রক্ষা করলেন না। ওয়াদার বরখেলাপ করলেন। তিনি বলেন, তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবেন না। আমি জাস্ট আপনাদেরকে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বলতে চাই, সত্তর সালে এই ভোটের রায়কে অমান্য করার জন্যই কিন্তু যুদ্ধ হয়েছিল।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এর আগে শেখ মুজিবুর রহমান দফায় দফায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য, ভোটের রায় মেনে নেওয়ার জন্য। পরবর্তীতে যুদ্ধ হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার অধিকার, শক্তি আমাদের কারো নাই। এটি করলে জনগণকে অপমান করা হবে। জনগণ চায় তাদের রায়ের বাস্তবায়ন। আমরা সেই দাবিগুলা নিয়ে নেমেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৫ বছর পার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি জাতির জন্য এই সময় নেহাত ছোট নয়।
মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বিশ্বে তার নিজস্ব জায়গা দখল করে রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান মাত্র তিন বছরের মাথায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সুইচ ওভার করতে সক্ষম হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি শাসক ও ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে শোষণ করেছেন এবং ব্যবসা করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর এসব সম্পত্তি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে আসে।
আদমজী জুট মিলকে বিশ্বের বৃহত্তম জুট ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজকে কি? আজকে আদমজীর নাম-নিশানাও মিটে গেছে। নাই, কিচ্ছুই নাই। স্বাধীনতার পরে সবকিছু হরিলুট! এখন একটা শিল্প পার্ক করা হয়েছে, কিন্তু সেই আদমজীর গৌরব ফিরে আসেনি।’
বাওয়ানী, সপাহানীসহ তৎকালীন ব্যবসায়ীদের বড় শিল্প-স্থাপনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কিছু শিল্প-স্থাপনা গড়ে উঠেছে, তবে তা যথেষ্ট নয়।
শিল্পের মূল শক্তি বিদ্যুৎ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গ্যাস, তেল ও সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তবে বাংলাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি এবং শিল্পে এর মারাত্মক আঘাত এসেছে।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টস শিল্পের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিজিএমইএ সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছে, চাহিদামতো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন কমে গেলে গার্মেন্টস মালিকেরা ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে পারবেন না এবং ঋণখেলাপি হবেন। শ্রমিকদের ধরে রাখতে না পেরে ছাঁটাই করতে বাধ্য হবেন। একই সঙ্গে ক্রেতাদের অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় তারা অন্য প্রতিযোগী দেশের দিকে চলে যাবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যেও অনেক গার্মেন্টস শিল্পের মালিক রয়েছেন। গত ৯ তারিখ মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সংসদে এ খাতের ব্যবসায়ীদের দুঃখ, আশঙ্কা ও ক্ষতির কথা তুলে ধরেছেন। গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনিও একই ধরনের আশঙ্কার কথা শুনেছেন বলে জানান। ‘অজানা গন্তব্যের দিকে আমরা রওনা করছি’—গার্মেন্টস শিল্পের মালিকদের এমন আশঙ্কার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সরকার গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরই মধ্যে ছয় মাস চলে গেছে। ‘এটা একটা জাতির ইতিহাসের ছোট্ট সময় নয়। অবশ্যই আমাদের সরকারকে এই সময়ের ভিতরে তার বিকল্প বের করা দরকার ছিল।
তিনি বলেন, তারা বারবার সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। সর্বশেষ চলতি মাসের ৭ তারিখেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সরকারকে একটি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিম দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাদের দেশে ও বিদেশে এই খাতে অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এর আগে তেলের সংকট দেখা দিলেও তিনি পাম্পে পাম্পে ঘুরেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সংসদে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সরকার সংকট অস্বীকার করেছে। বিদ্যুৎ সংকটও অস্বীকার করা হয়েছে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে ৩০০ ধারায় বলেছেন, বিদ্যুতের তার লম্বা, এ জন্য দেরি হয় এবং কারেন্টের সাপ্লাই ঠিকমতো দেওয়া যায় না। সংসদে কিছু করতে না পারায় তারা ছয় দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বলে জানান ডা. শফিকুর রহমান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ করা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের জন্য সার সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আন্দোলনের দ্বিতীয় ফেজে লং মার্চ শুরু হয়েছে। লং মার্চে গাড়ি ব্যবহারের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, গাড়িগুলো না নিলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহার করতেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খরচ হতো। বরং জাতীয় প্রয়োজনে কর্মসূচিতে অংশ নিতে তারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, চাইলে কয়েক হাজার গাড়ি নিয়ে রওনা হতে পারতেন। কিন্তু তা না করে প্রতীকী একটি কাফেলা নিয়ে রওনা হয়েছেন।
লং মার্চকে কেন্দ্র করে আশঙ্কা, আতঙ্ক ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের কর্মী-সমর্থকেরা জনগণের দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন। বড় কর্মসূচিতে রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নামলেও কোথাও বিশৃঙ্খলা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, তাদের দ্বিতীয় কর্মসূচি ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত একই সড়ক দিয়ে যাবে। ‘আমরা মানুষকে সচেতন করে তুলতে চাই, অধিকার কেউ ঘরে এনে দেবে না। অধিকারের জন্য সোচ্চার হতে হবে। রাজনৈতিক দল উদ্যোগ নেবে, জনগণ তাতে সাড়া দেবে, এভাবেই জনগণের দাবি পূরণ হবে।’
জনজীবনে যাতে কোনো দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে তারা সচেতন থাকবেন বলেও জানান তিনি।
বিরোধীদলের দায়িত্ব সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ তো আমাদের সবার। বিরোধীদল হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের অধিকারের পাহারাদারি করা, চৌকিদারি করা। ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করা।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের হাতে স্বৈরাশাসন কায়েম হয় না, কারণ তারা শাসক নয়। ‘শাসক সুশাসক হতে পারে, স্বৈরশাসক হতে পারে।
সাড়ে ১৫ বছর স্বৈরশাসনের কবলে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক নেতৃত্বকে হারাতে হয়েছে। অনেকে গুম হয়ে এখনও ফিরে আসেননি। স্বজন হারানো পরিবারের কান্না এখনও শেষ হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এই ট্রমা, এই কষ্ট, এই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে জাতি চব্বিশের বিপ্লব সফল হওয়ার পরে আশা করেছিল দেশের শাসনযন্ত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তনের লক্ষ্যেই একটা গণভোট ব্যাপক সংস্কারের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল।গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান ডা. শফিকুর রহমান।
(ঢাকা টাইমস/১২সেপ্টেম্বর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











