যেখানে সেখানে ধূমপান, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অধূমপায়ীরাও

ধূমপান শুধু ব্যক্তিগত বদভ্যাস নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরাসরি ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ও তৃতীয় স্তরের ধূমপান (থার্ড-হ্যান্ড স্মোকিং) অধূমপায়ীদেরও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলছে। জনসমাগমস্থলে ধূমপান বন্ধে আইন থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জ্বলন্ত সিগারেট থেকে প্রায় ১২ হাজার ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়, যার মধ্যে নিকোটিন, টার, কার্বন মনোক্সাইড এবং বিভিন্ন ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান শুধু ধূমপায়ীর শরীরেই নয়, আশপাশে থাকা মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি ধূমপানের সমতুল্য। এছাড়া বর্তমানে আলোচনায় এসেছে ‘থার্ড-হ্যান্ড স্মোকিং’, যেখানে ধূমপানের পর ঘরের দেয়াল, কার্পেট, আসবাবপত্র ও অন্যান্য পৃষ্ঠে জমে থাকা রাসায়নিক পদার্থ দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বদ্ধ ঘর বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ধূমপান করলে ক্ষতিকর রাসায়নিক কণাগুলো বাতাসে দীর্ঘ সময় ভাসমান থাকে। এসি দৃশ্যমান ধোঁয়া কমাতে পারলেও ধোঁয়ার অধিকাংশ বিষাক্ত উপাদান দূর করতে পারে না। ফলে একই ঘরে অবস্থানকারী অন্যরাও ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং বিভিন্ন অ্যালার্জিজনিত সমস্যার ঝুঁকিতে পড়েন।
শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং অধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের হাঁপানি, নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির প্রবেশদ্বার হিসেবেও কাজ করে। ধূমপায়ীদের সামাজিক পরিমণ্ডলে নতুনদের ধূমপানে উৎসাহিত করার প্রবণতা দেখা যায়, যা পরবর্তীতে মাদক গ্রহণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন শহর, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকা, গণপরিবহন, পার্ক, সরকারি-বেসরকারি অফিস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে প্রকাশ্যে ধূমপানের ঘটনা এখনও নিয়মিত দেখা যায়। অথচ জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে ২০০৫ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে তামাকজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তামাকসেবীদের হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যক্ষা ও ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে দেশে ৩০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৭০ লাখের বেশি মানুষ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
এছাড়া ১৫ বছরের কম বয়সী চার লাখের বেশি শিশু তামাকজনিত স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পরিবারের সদস্যদের ধূমপানের কারণে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধূমপায়ীদের সুরক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং জনসমাগমস্থলে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বা ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব ধরনের পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
(ঢাকাটাইমস/৩১ মে/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













