‘দস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান কোস্ট গার্ডের, না শুনলে কঠোর ব্যবস্থা’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১২ জুন ২০২৬, ১০:৪৪
অ- অ+

সুন্দরবনে এখনও ছয় থেকে আটটি বনদস্যু ও জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। বাহিনীটির দাবি, সুন্দরবনে দস্যু দমনে ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অপরাধচক্র কোণঠাসা হয়ে পড়ায় মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ড স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার পেছনে দস্যু ও তাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

গত ১১ জুন বাগেরহাটের মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্টগার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে একদল দুর্বৃত্ত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য আহত হন। হামলার ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। স্টেশন স্থাপনের পর অস্ত্র, রসদ ও লজিস্টিক সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় অসন্তুষ্ট চক্রটি হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

শুক্রবার মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব তথ্য জানান পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম।

তিনি বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে ছয় থেকে আটটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি বাহিনীতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ জন সদস্য থাকে। বড় বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে অনেক সময় ছোট ছোট উপদল বা ‘ক্লোন’ বাহিনী গড়ে ওঠে। এসব বাহিনী মূলত জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের লক্ষ্য করে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধে জড়িত।

কোস্টগার্ডের দাবি, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে চলমান অভিযানে দস্যুদের সক্ষমতা কমে এসেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে পরিচালিত অভিযানে ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যু ও জলদস্যুকে আটক এবং ৪১ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে।

মেসবাউল ইসলাম বলেন, “কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি ও অভিযানের কারণে দস্যুরা আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা কমে এসেছে।” তাঁর ভাষ্য, এই চাপের মধ্যেই সম্প্রতি কুখ্যাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধানসহ কয়েকজন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।

কোস্টগার্ড কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনের অসংখ্য সরু খাল ও ন্যারো চ্যানেল এখনও দস্যুদের আত্মগোপনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তবে ড্রোন প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে দুর্গম এলাকাও পর্যবেক্ষণে আনা হয়েছে।

তবে মোংলার হামলার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে ভিন্ন ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে নিখোঁজ এক জেলেকে ঘিরে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উত্তেজনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।

সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা বজায় রাখা সহ উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ কার্যক্রম ও অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে থেকে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন।

বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় সকল বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌওয়ালি ও বনজীবীদের সুন্দরবনে অবস্থানকালীন এবং জীবিকানির্বাহকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে 'অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন' এবং 'অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড' নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ১টি ককটেল, ১টি টেলিস্কোপ এবং ২টি ওয়াকিটকিসহ ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়। এসময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। আমরা সুন্দরবনের সকল সক্রিয় ডাকাতদের দস্যুবৃত্তি পরিহার করে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। তবে কেউ যদি এই আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠু প্রজনন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ঘোষিত তিন মাসব্যাপী পর্যটক প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা, অবৈধ মাছ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনে নৌবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত টহল, বন্দর চ্যানেল ও নৌপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং বাংলাদেশ ভারত নৌ প্রটোকল রুটে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মোংলা বন্দরের কার্যক্রম সচল, নিরাপদ ও গতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

একইসাথে দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদী তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পুশ-ইন প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক ড্রোন ও সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে বিশেষ একক ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে সুন্দরবনের মোংলা থানাধীন জযমনির ঘোল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় উক্ত এলাকায় কোস্ট গার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বনদস্যুদের কাছে রসদ, লজিস্টিক সহায়তা, অস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের পথ কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বনদস্যু ও তাদের সহযোগীরা উক্ত এলাকায় কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি চায় না।

এরই প্রেক্ষিতে গত ১১ জুন জযমনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্ট গার্ড স্টেশনে একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্ট গার্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। একইসাথে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

তবে কোনো ধরনের অপপ্রচার, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। আইন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পরিচালিত কার্যক্রম ভবিষ্যতেও একই দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অব্যাহত থাকবে। এ ব্যাপারে আপনাদের সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সুন্দরবন, উপকূলীয় অঞ্চল, দেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রথম সিনেমার ঘোষণা দিলেন আদনান আল রাজীব
বিশ্বকাপের এবার সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ভাঙার লড়াইয়ে মুখোমুখি মেসি-এমবাপ্পে
সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ২৩
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দলে ডাক পেলেন সেনেসি
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা