পারমাণবিক জ্বালানির রহস্য, জানুন যেভাবে ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূলভিত্তি হলো পারমাণবিক জ্বালানি, যা প্রধানত ইউরেনিয়াম থেকে প্রস্তুত করা হয়। এই জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক খনিজ, যা মাটি থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করার পর পারমাণবিক জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়। জ্বালানিটি ছোট ট্যাবলেট বা প্যালেট আকারে তৈরি করা হয়, যা দেখতে পেন্সিলের রাবারের মতো। এসব প্যালেট ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় ফুয়েল রড। পরবর্তীতে একাধিক ফুয়েল রড একত্র করে তৈরি করা হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি, যা রিঅ্যাক্টরের (চুল্লি) ভেতরে স্থাপন করা হয়।
পারমাণবিক জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো Uranium-235। এটি ইউরেনিয়ামের একটি আইসোটোপ, যা সহজে বিভাজিত হতে পারে। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিউট্রনের আঘাতে এই ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু ভেঙে যায়, যাকে বলা হয় Nuclear fission।
এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয় এবং নতুন নিউট্রন তৈরি হয়, যা আবার অন্য পরমাণুকে বিভাজিত করে। এভাবে চলতে থাকা ধারাবাহিক বিক্রিয়াকে শৃঙ্খল বিক্রিয়া বলা হয়। উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে সাধারণত ১৫০ থেকে ২৫০টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি থাকে। তবে কয়েক বছর ব্যবহারের পর জ্বালানির কার্যকারিতা কমে যায়। এজন্য প্রতি ১৮ থেকে ২৪ মাস পর রিঅ্যাক্টরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়। ব্যবহৃত জ্বালানিকে স্পেন্ট ফুয়েল বলা হয়, যা অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় হওয়ায় বিশেষ নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করতে হয়।
এদিকে, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ আজ থেকে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করেছে।
জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যা দেশের জ্বালানি খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভারী ধাতব মৌল। এটি পৃথিবীর ভূত্বকে স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। ইউরেনিয়াম দেখতে রুপালি-ধূসর রঙের। এটি পানির তুলনায় প্রায় ১৮.৭ গুণ ঘন। প্রকৃতিতে পাওয়া যাওয়া সব ধাতুর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ভারী। রাসায়নিক সারণিতে এর প্রতীক U এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৯২।
১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ পিচব্লেন্ড ইউরেনিয়াম মৌল আবিষ্কার করেন। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন।
প্রায় ১০৭ বছর পর, ১৮৯৬ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকরেল আবিষ্কার করেন যে ইউরেনিয়াম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অদৃশ্য রশ্মি নির্গত করে। সেটাই ছিল প্রথম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার।
ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর কিছু আইসোটোপের (পরমাণুর ভিন্ন রূপ) সহজে ভাঙার প্রবণতা। একে নিউক্লিয়ার ফিশন বলা হয়। ফিশনের সময় একটি পরমাণু ভেঙে দুটি ছোট পরমাণুতে বিভক্ত হয় এবং এতে বিপুল পরিমাণ শক্তি (তাপ এবং বিকিরণ) উৎপন্ন হয়। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এই শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
তুলনা দিয়ে বলা যায়, এক কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফিশন থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার শক্তি পাওয়া সম্ভব, যা ৩৪ লাখ টন বেশি কয়লার সমান।
ইউরেনিয়াম-২৩৫ তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দিয়ে সহজে ফিশন বিক্রিয়া ঘটানো যায়।
বিশ্বের অনেক দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের রূপপুরেও জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হচ্ছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত ফিশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়, যা পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি কার্বন-ডাইঅক্সাইড নির্গমন হয় না বলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। তবে এতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয়।
(ঢাকাটাইমস/২৮ এপ্রিল/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































