বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে: ইস্তাম্বুল সামিটে আইনমন্ত্রী

ইস্তাম্বুলে আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিটে বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, বর্তমান বিশ্বের বহুমাত্রিক সংকট কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মানবাধিকার সুরক্ষা, অভিবাসন, সাইবার অপরাধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে তৈরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোকে অভিন্ন দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ‘আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-ইস্তান্বুল, ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ একদিকে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছে ও সেবা প্রদান সহজ করেছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের বৈষম্য, বিভাজন ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অভিন্ন দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও সভ্যতার মিলনস্থল হিসেবে ইস্তাম্বুল বৈশ্বিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত স্থান। বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি তুরস্কের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংহতির কথাও স্মরণ করেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা চাকরি ও সরকারি সেবায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তুলেছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও এসব ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার সরকারের মেয়াদে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক চ্যালেঞ্জ নয়, দেশের সম্পদ, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একা এই বৈশ্বিক বোঝা বহন করতে পারে না এবং তার কাছ থেকে তা প্রত্যাশাও করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্বের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। কক্সবাজারে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানের সফর এবং তুরস্কের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। এখন এই সংহতিকে আরও টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে।
প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সাইবার অপরাধ, ক্ষতিকর কনটেন্ট, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপপ্রচার ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এসব সমস্যার কোনো সীমান্ত নেই। তাই কোনো দেশের একক আইন দিয়ে আন্তঃসীমান্ত প্রযুক্তি কোম্পানি বা ডিজিটাল অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের বৈশ্বিক সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে প্রকৃত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ফরেনসিক জ্ঞান এবং আইন ও বিচারসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সীমান্ত নির্ধারণ, জ্বালানি বাজার, মেধাস্বত্ব ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত বিরোধ দ্রুত বাড়ছে। এসব বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সবার জন্য সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচার কখনো এমন হতে পারে না, যা শুধু ক্ষমতাবানদের নাগালের মধ্যে থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিশ্ব এখন অপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যে ক্লান্ত। বড় বড় ঘোষণা বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারে না, ডিজিটাল একচেটিয়াত্ব বন্ধ করতে পারে না কিংবা নিপীড়নের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে না।
তিনি বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। এমন বৈশ্বিক দায়িত্ববণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে এমন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, যা কোনো দেশ একা সমাধান করতে পারে না।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিটের মতো আয়োজন বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, বিচারক, আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছে। সম্মিলিত আলোচনা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও ন্যায়সংগত, কার্যকর ও সাড়া-দানে সক্ষম বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থার দিকে একটি বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ইস্তাম্বুলে ৮ ও ৯ অক্টোবর ‘আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-ইস্তান্বুল, ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বের ৭৫টি দেশের বিচারমন্ত্রী, বিচারক, আইনবিদ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতে অংশ নিচ্ছেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











