ইয়েমেনে হুথিরা কারা, কীভাবে অস্ত্র পায় তারা?

হুথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। ‘আনসার আল্লাহ’ শব্দের অর্থ আল্লাহর সমর্থক। গোষ্ঠীটির নাম এসেছে এর প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথির নাম থেকে। বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী জায়েদি শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে হুথি আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। জায়েদিরা শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র শাখার অনুসারী। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে তাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে হুথি আন্দোলনের উত্থান ঘটে। শুরুতে তারা উত্তরাঞ্চলের জায়েদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সামনে নিয়ে আসে। পরে আন্দোলনটি সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
২০০০ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহে অংশ নেয় হুথিরা। উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা নিজেদের এলাকায় আরও স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানায়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। এর পরিণতিতে প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন এবং তাঁর ডেপুটি আবদ্রাব্বুহ মানসুর হাদি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও ক্ষমতা ভাগাভাগি, অর্থনৈতিক সংকট ও আঞ্চলিক বিরোধের সমাধান হয়নি।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে। পরবর্তী সময়ে তারা দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট হাদিকে দেশ ছাড়তে হয়। এর পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে।
বর্তমানে হুথিরা রাজধানী সানা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এসব অঞ্চলে ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ বসবাস করে। সেখানে কর আদায়, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা কার্যত একটি সরকারব্যবস্থা চালায়।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ দেশের অন্যান্য অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী এডেন।
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হুথিদের বিভিন্ন অবস্থান ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ২ হাজার ৭৫০টির বেশি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় গোষ্ঠীটির ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এবং হতাহতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাধিব এসব তথ্য জানান। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামের অভিযানের আওতায় হুথিদের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনের সামরিক মুখপাত্রের দাবি, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষাব্যূহ, সামরিক অবস্থান, পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা চৌকি, কামানের অবস্থান, অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদাম, সরবরাহকেন্দ্র এবং সামরিক রসদবাহী বহর। হুথিদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের গভীরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাও হামলার আওতায় এসেছে বলে জানান তিনি।
আল-নাধিব আরও দাবি করেন, অভিযানে ২৫০টির বেশি সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থলবাহিনী হুথিদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবস্থান পুনর্দখল করেছে এবং সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। নির্ধারিত সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে ইয়েমেনের সংঘাত কেবল দেশটির সরকার ও হুথিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইরানের ভূমিকা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থ এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রের উৎস নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কতটা গভীর?
হুথিদের সামরিক শক্তির অন্যতম আলোচিত উৎস ইরানের সম্ভাব্য সহায়তা। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে। এসব সহায়তার মধ্যে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি এবং যন্ত্রাংশ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে হুথিদের চালানো হামলায় উন্নত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার পরও তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তির উৎস নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরালো হয়।
তবে ইরান হুথিদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, তারা রাজনৈতিকভাবে হুথিদের সমর্থন করে। অন্যদিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক থাকলেও গোষ্ঠীটিকে কেবল ইরানের নির্দেশে পরিচালিত একটি সংগঠন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে হুথিদের উত্থান ঘটেছে এবং তাদের নিজস্ব লক্ষ্য ও স্বার্থ রয়েছে।
ইরানের সহায়তার মাত্রা নিয়ে মতভেদ থাকলেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাইরের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় আলোচনা করা হয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কাছ থেকেও হুথিরা সামরিক পরামর্শ ও সহায়তা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ককে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ সঙ্গে হুথিরা নিজেদের সম্পৃক্ত বলে দাবি করে। এই জোটের মধ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনও রয়েছে।
কীভাবে অস্ত্র পায় হুথিরা?
হুথিদের অস্ত্রভান্ডারের উৎস একক নয়। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, দেশটির পুরোনো সামরিক মজুত, স্থানীয় অস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা এবং বিদেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ পাওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাদের সামরিক শক্তি গড়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
প্রথমত, পুরোনো সামরিক মজুত। ইয়েমেনের সেনাবাহিনীতে গৃহযুদ্ধের আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, কামান, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। যুদ্ধের সময় সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর ফলে এসব অস্ত্রের কিছু অংশ হুথিদের হাতে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ। হুথিদের ব্যবহৃত কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ইরানি অস্ত্রের মিল থাকার কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান তাদের কাছে অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট অস্ত্রের উৎস এবং সরবরাহের প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজন। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিরা বিদেশি প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ ব্যবহার করে কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন বা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। এতে তাদের অস্ত্রের সরবরাহ কেবল সরাসরি বিদেশি চালানের ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
চতুর্থত, দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। বহু বছর ধরে সরকারি বাহিনী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে হুথিরা নিজেদের সামরিক সংগঠন, অস্ত্র পরিচালনা এবং আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রতিপক্ষের সামরিক সরঞ্জাম ও স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও পেয়েছে।
অস্ত্রের উৎস নিয়ে তদন্তে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে চালান আটক এবং বিভিন্ন অস্ত্রের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে হুথিদের কাছে থাকা সব অস্ত্রের উৎস বা সরবরাহপথ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
সৌদি আরব কেন ইয়েমেন যুদ্ধে জড়ায়?
হুথিদের রাজধানী সানা দখল এবং দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সৌদি আরব তাদের নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। সৌদি নেতৃত্বের আশঙ্কা ছিল, হুথিরা পুরো ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করলে দেশটি ইরানের কৌশলগত প্রভাবের আওতায় চলে যেতে পারে।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব সামরিক জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সামরিক ভূমিকা পালন করে।
বহু বছরের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের পরও হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রধান অঞ্চলগুলো থেকে তাদের সরানো সম্ভব হয়নি। সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের অবকাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলার ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটেও পরিণত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা
ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশটি বিভিন্ন স্থানীয় বাহিনীকে সহায়তা দিয়েছে, যাদের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও সরকারপন্থী সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে।
২০১৮ সালে লোহিত সাগরের উপকূলীয় বন্দরনগরী হুদেইদাহকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে। ওই সময় আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীগুলো হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনে নিজেদের সরাসরি সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনলেও স্থানীয় মিত্রদের সহায়তা অব্যাহত রাখে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বাহিনী এবং হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষের পাশাপাশি সৌদি আরব ও আমিরাতের সমর্থিত ইয়েমেনি পক্ষগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে থাকা সব বাহিনীর লক্ষ্য ও কৌশল সব সময় এক নয়।
ইয়েমেনের সংঘাতকে জটিল করে তোলার পেছনে এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ। হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালেই যে দেশটির সব বিরোধের সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা কেন চালায় হুথিরা?
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নৌপথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। লোহিত সাগর থেকে সুয়েজ খালে প্রবেশের পথ হওয়ায় এর নিরাপত্তা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর হুথিরা ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালানোর ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানানো এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধে চাপ সৃষ্টি করতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ‘গ্যালাক্সি লিডার’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ দখল করে নেয় হুথিরা। এরপর বিভিন্ন সময়ে লোহিত সাগর ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহন খাতে উদ্বেগ বাড়ে।
হুথিদের দাবি, তাদের লক্ষ্য ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজ। তবে হামলার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজও প্রভাবিত হয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুথিদের জাহাজে হামলার জবাবে ইয়েমেনে তাদের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন ও লন্ডনের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষায় এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হুথিরা জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের অবস্থান থেকে তারা সরে আসবে না।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে মানবিক বিপর্যয়
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক পরিবার খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়েছে।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, ইয়েমেনের বিপুলসংখ্যক মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং অবকাঠামোর ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক বিভাজন এবং বন্দর ও সরবরাহপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোকে কঠিন করে তুলেছে। যুদ্ধের প্রভাবে শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শান্তি আলোচনা কেন কঠিন?
ইয়েমেনে যুদ্ধ কমানো ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যেও যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলেছে। ওমান এ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
তবে স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা, ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক সম্পদের বণ্টন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক স্বার্থের বিরোধ।
লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা ও এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানও ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
সামনে কী হতে পারে?
হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের দাবিগুলো সত্য হলে তা দেশটির সংঘাতের নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে শুধু হামলার সংখ্যা বা হতাহতের দাবি দিয়ে সামরিক অভিযানের প্রকৃত ফলাফল নির্ধারণ করা যায় না। কোন কোন এলাকা পুনর্দখল হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ কতটা স্থায়ী হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়েছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে হুথিদের অস্ত্রের উৎস ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের সম্ভাব্য সহায়তা, স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংযোজন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা গোষ্ঠীটিকে শক্তিশালী করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তির জন্য সামরিক অভিযান ছাড়াও রাজনৈতিক সমঝোতা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং দেশটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায়, দীর্ঘদিনের এই সংঘাত ইয়েমেনের জনগণকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
(ঢাকাটাইমস/১১ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











