টঙ্গীর বস্তিতে অপরাধের সাম্রাজ্য: মাদক, দেহব্যবসা ও হত্যাকাণ্ডের বিশাল সিন্ডিকেট

গাজীপুরের টঙ্গীতে বস্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক কারবার, দেহব্যবসা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ডও। পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে এসব চক্র তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তিতে মাদকের একাধিক স্পট রয়েছে। এসব স্পট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক সরবরাহ করা হয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাদক কারবারে সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না মাদক বাণিজ্য।
মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটছে সংঘর্ষ, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে হামলা, মামলা এমনকি প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।
সরেজমিনে জানা যায়, প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস টঙ্গীতে। ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ এলাকায় ভোটার প্রায় চার লাখ। এসব ওয়ার্ডে রয়েছে ১৯টি বস্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বস্তির কয়েকটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে মাদকের বড় সিন্ডিকেট। টঙ্গীবাজার-সংলগ্ন হাজী মাজার বস্তি, কেরানির টেক, ব্যাংক মাঠ বস্তি, আমতলী বস্তি, মিলগেট বস্তি, এরশাদনগর, শিলমুন, মরকুন, আরিচপুর, গাজীপুরা, পাগাড় ও গোপালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার রয়েছে।
বস্তিতে কারবার, বাইরে বিলাসবহুল বাড়ি
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যাংক মাঠ বস্তির লাকী নামে পরিচিত এক নারী মাদক কারবারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বস্তিতে বসবাস করলেও টঙ্গীর নোয়াগাঁও এলাকায় তার বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকার তাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রুজির বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শিলমুন দক্ষিণপাড়া ও পুবাইলের চামুড্ডা এলাকায় তাদের একাধিক বাড়ি এবং চামুড্ডায় একটি বড় রিসোর্ট রয়েছে।
ব্যাংক মাঠ বস্তির মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত মোমেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ, টঙ্গীর মরকুন ও মিরেরবাজারের তালুটিয়া এলাকায় তার দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। একইভাবে গোপালপুরের আরফিনা এবং তার ছোট বোন শামীমার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, আলোচিত হাজী মাজার বস্তির কিং বাবু নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ব্যক্তি বস্তিকেন্দ্রিক কারবার পরিচালনা করলেও বসবাস করেন বস্তির বাইরে বিলাসবহুল বাড়িতে।
তবে এসব অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কারাগারে, কেউ পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে সম্পদের তথ্যও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক কারবার ঘিরে হত্যাকাণ্ড
মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টঙ্গীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ব্যাংক মাঠ বস্তির লাকীর ছেলে হাসানের বিরুদ্ধে রফিকুল ইসলাম জয় নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে ১ সেপ্টেম্বর রাতে টঙ্গীর গোপালপুর এলাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে নূরুল ইসলাম নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ ধরনের সহিংসতা, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড আরও বাড়তে পারে।
অভিযানে গ্রেপ্তার অনেকে
থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর ৫০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল নেতা রাহাতকে ঢাকার তেজগাঁও এলাকা থেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া এরশাদনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আলো, রিতা, খালেদা ভান্ডারী ও কলা আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কেরানির টেক এলাকা থেকে আট কেজি গাঁজাসহ নার্গিসকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই এলাকায় যুবদল নেতা খালেকের স্ত্রী টুনি ও রানীকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক মাঠ এলাকার মোমেলা, সালমা, রুজি ও মিনারাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গাজীপুরা এলাকা থেকে ১০ কেজি গাঁজাসহ সাজেদা নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া মরকুন এলাকা থেকে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রহিমকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব এলাকায় ছোট-বড় মাদক কারবারিদের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশও সক্রিয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। তাদের সহযোগী হিসেবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় আরও অনেক নারী কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে শুরু করে পরে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার কারবারে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মোমেলা বেগমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, জমি ও যানবাহন রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। গত বছরের ২ নভেম্বর তাঁকে ইয়াবা ও হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক আলোচিত নারী মাদক কারবারি ময়না খাতুন। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। ময়নার মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে।
ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মাদক কারবারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে গাজীপুর ও মাদারীপুরে সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারকেও স্থানীয়ভাবে বড় মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে আগে ফেনসিডিলের পাইকারি কারবার এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
কেরানীরটেক বস্তিতে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে কুলসুমের বিরুদ্ধে। একসময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও মাদক কারবারের মাধ্যমে তার সম্পদ বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
একই এলাকার আরেক নারী কারবারি হিসেবে কারিমা বেগমের নামও উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গত ১৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের মাদক কারবারের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদকের প্রতিবাদ করায় হামলার অভিযোগ
টঙ্গীর মরকুন এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা শেখ নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কয়েকদিন আগে মরকুন বেপারীপাড়া এলাকায় মাদক নিয়ে কথা বলায় শুভ ও সোহানা নামে দুই ব্যক্তি তাকে কুপিয়ে জখম করেন। এ ঘটনায় তিনি টঙ্গী পূর্ব থানায় মামলা করেছেন। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে দাবি তার।
শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন ঘরে ঘরে মাদক। সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
দুই থানায় শতাধিক মামলা, গ্রেপ্তার পাঁচ শতাধিক
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, গত দুই মাসে তার থানায় মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ৩৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. মাকছুদুল আলম জানান, বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে গত দুই মাসে অর্ধশতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত প্রায় ৫০টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি ছিনতাইসহ অন্যান্য মামলায় পাঁচ শতাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক মাঠ বস্তিসহ টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারে জড়িতদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের অনেকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন এবং পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বর্তমানে অনেকে পলাতক রয়েছেন। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইয়াবার বড় চালানসহ নারী গ্রেপ্তার
গাজীপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম মিঠুন জানান, গত ১ অক্টোবর টঙ্গী পূর্ব থানার আরিচপুরের মদিনাপাড়া এলাকায় শাহানারা মঞ্জিলে অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ শ্রাবন্তী আক্তার (২০) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া মরকুনে আইয়ুব আলীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছয় হাজার পিস ইয়াবাসহ আরেক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত এক মাসে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮০ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার এবং ১৫টি মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
টঙ্গীর বস্তিগুলোতে মাদক কারবার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধের বিস্তার থামছে না। মাদক কারবারের অর্থের উৎস, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক এবং তাদের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
(ঢাকাটাইমস/৩১ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













