সড়কে প্রাণহানি রোধে চাই সমন্বিত নিরাপত্তা আইন ও কার্যকর বাস্তবায়ন

তামান্না মিজান
  প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০৬
অ- অ+

সড়ক মানুষের চলাচল, জীবিকা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অথচ এই সড়কেই প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এর প্রভাব পড়ে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর। তাই সড়ক নিরাপত্তা কেবল পরিবহন খাতের কোনো কারিগরি বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—সড়কে মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা কমাতে আমরা কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছি? দিবসটি পালন ও সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩-এর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই বছরের সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪। মৃত্যুর এই বড় ব্যবধান সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনে।

নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা কঠিন। তাই পুলিশ, হাসপাতাল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

দুর্ঘটনা নয়, প্রতিরোধযোগ্য প্রাণহানি

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্সের ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা এবং সড়কের নকশাগত ত্রুটিসহ বিভিন্ন ঝুঁকি কাজ করে। পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের সুযোগের অভাব, ফুটপাত দখল, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়াও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।

এ সমস্যার সমাধান কেবল চালক বা পথচারীকে দোষারোপ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দায়িত্ব সড়ক পরিকল্পনাকারী, নকশা ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, যানবাহনের মালিক, পরিবহন পরিচালনাকারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষের। সড়কব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষের অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও তার পরিণতি প্রাণঘাতী না হয়।

এই দর্শনের ভিত্তি হলো ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ সড়কব্যবস্থা পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী, নিরাপদ যানবাহন এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর জরুরি সেবাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শুধু একটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিলেই চলবে না; বরং সব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন কেন জরুরি

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। তারপরও সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন আইনের উদ্দেশ্য শুধু শাস্তির বিধান বাড়ানো হওয়া উচিত নয়। বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সুরক্ষা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হতে হবে এর মূল লক্ষ্য।

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকায় ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রাম ও রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘Government Commitment to Improving Road Safety in Bangladesh’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা জানান।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, নির্ধারিত সময়সীমা, কার্যকর সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ।

নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

প্রথমত, প্রতিরোধকে আইনের কেন্দ্রে রাখতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও মোড় চিহ্নিত করে নিরাপদ নকশা, পথচারীদের রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত, সাইকেল চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপদ গতি ও যানবাহনের মান নিশ্চিত করতে হবে। সড়কের ধরন, আশপাশের পরিবেশ এবং পথচারীদের উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গতিসীমা নির্ধারণ ও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহীদের জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান এবং বাণিজ্যিক পরিবহনের নিরাপত্তা তদারকি জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা সাধারণ মানুষের জন্য যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

চতুর্থত, দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্ট করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কে যানবাহনের মান তদারকি করবে, কে আইন প্রয়োগ করবে এবং দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব কার—আইনে তা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোনো সড়কে গুরুতর ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার পরও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধান থাকতে হবে।

পঞ্চমত, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ, হাসপাতাল, বিআরটিএ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দুর্ঘটনার স্থান, কারণ, নিহত ও আহতের সংখ্যা এবং ঝুঁকির ধরন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে যেতে হবে

আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া তা প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল, ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে নতুন আইনের কার্যক্রম সমন্বয় করে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।

এ প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যম, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। আইনের খসড়া পর্যালোচনা, জনপরামর্শ এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আইনটি আরও কার্যকর ও জনবান্ধব হবে।

সরকারের সাম্প্রতিক অঙ্গীকার এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে এখনই আইনের খসড়া প্রস্তুত ও পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, দায়িত্ব বণ্টন এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন ও প্রকাশ করতে হবে।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে। প্রতিটি প্রাণের মূল্য আছে। সড়কে প্রাণহানি কমানো কোনো একক সংস্থা বা ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন, তার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি বাংলাদেশের সড়ককে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই এখন সময় অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার।

আমাদের দাবি স্পষ্ট: ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, আইনটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

লেখক: রোড সেফটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দেশে প্রথম এআই প্রযুক্তিতে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গ্যাপ’
পুলিশের ৭ কর্মকর্তার দায়িত্বে রদবদল, একজনের বদলির আদেশ বাতিল
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে জেনেটিক বায়ো-কাউন্সেলিং সেবা
আত্মার ভয় থেকে হ্যালোইন উৎসব, জানুন অজানা কাহিনি