বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: জাপানের বিগ-বি কৌশলে ঢাকা কতটা লাভবান হতে পারবে?

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪২| আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৪
অ- অ+

বাংলাদেশের ভূগোল তার জন্য একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও সম্ভাব্য কৌশলগত পরীক্ষার ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। তার সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার রয়েছে, রয়েছে বিপুল জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান ভোক্তাবাজার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। অথচ এই ভৌগোলিক সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ফলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনার পুনর্বিন্যাসকে নিছক একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত জাপান সফরকে এই বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে অংশগ্রহণ এবং টয়োটা ও জেরা-সংশ্লিষ্ট শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শনের কর্মসূচি অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, বিনিয়োগের অঙ্ক কিংবা যৌথ বিবৃতির কূটনৈতিক ভাষায় নয়; বরং এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কাঠামোয় কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপর।

২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে প্রস্তাবিত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি ছিল বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের একটি দীর্ঘমেয়াদি ধারণা। মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল এবং পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভূগোলকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার সম্ভাবনা এতে নিহিত ছিল। সময়ের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস বিগ-বির তাৎপর্য আরও বিস্তৃত করেছে। এর নতুন রূপে বিনিয়োগ, জ্বালানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে পরস্পরসম্পর্কিত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য হলো, জাপান এখন বাংলাদেশকে কেবল উন্নয়ন সহযোগিতা গ্রহণকারী দেশ হিসেবে দেখার পরিবর্তে উৎপাদন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তবে এ ধরনের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের হাতে আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল, দক্ষ আলোচনাপ্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগের শর্ত নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। জাপানি উন্নয়ন সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, প্রকৌশলগত দক্ষতা এবং অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের সামনে আরও বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: অবকাঠামো নির্মাণের পর সেই অবকাঠামো ব্যবহার করে কতটা উৎপাদন, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে?

একটি বন্দর নির্মিত হওয়া আর একটি কার্যকর বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে ওঠা এক বিষয় নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা আর শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। একইভাবে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া আর সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে। বিগ-বির সাফল্য নির্ভর করবে অবকাঠামোকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতার ওপর।

জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে টয়োটার সম্ভাব্য গাড়ি সংযোজন কারখানায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথাও এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণকে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন, জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুতি, নীতিগত অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

টয়োটার সম্ভাব্য বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু দেশে গাড়ি সংযোজন নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ মোটরযান-সহায়ক শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ। গাড়ি শিল্পের সঙ্গে ইস্পাত, প্লাস্টিক, রাবার, কাচ, বৈদ্যুতিক তার, ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ, প্রকৌশলসেবা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশীয় সরবরাহকারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের সনদ অর্জন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে বিনিয়োগের সুফল একটি কারখানার সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।

অন্যথায় স্থানীয় বাজারের জন্য সীমিত সংযোজন কার্যক্রমের মধ্যেই প্রকল্পটির অর্থনৈতিক প্রভাব আবদ্ধ থাকতে পারে। আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশ দিয়ে গাড়ি সংযোজন করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও দেশীয় মূল্য সংযোজন প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে। তাই বিনিয়োগ চুক্তিতে স্থানীয় সরবরাহকারী উন্নয়ন, প্রকৌশল প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পকে অযৌক্তিক সুরক্ষা দিয়ে অদক্ষতা দীর্ঘস্থায়ী না করে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

এখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সরকারের দায়িত্বের একটি অংশ; কিন্তু সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিল্পভিত্তি কতটা গভীর হবে, সেটিই হওয়া উচিত জাতীয় সাফল্যের প্রধান সূচক। বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি স্থানান্তরিত হলো, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কতটা সরবরাহকারী হিসেবে যুক্ত হলো এবং রপ্তানির নতুন বাজার কতটা উন্মুক্ত হলো—এসব প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রকে খুঁজতে হবে।

তবে শিল্পায়নের এই সম্ভাবনার সামনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। গ্যাসের স্বল্পতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। অনিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে দুর্বল করে এবং উৎপাদনক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করে। এ অবস্থায় জাপানের জেরা যদি মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে বাস্তব বিনিয়োগ করে, তবে তা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণই জ্বালানি সমস্যার পূর্ণ সমাধান নয়। আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, পরিবহন ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার, টার্মিনাল ব্যবহারের খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থিক সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হয়। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ডলারের সংকট দেখা দিলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা নতুন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অতএব, বাংলাদেশের জ্বালানি কৌশল হওয়া উচিত বহুমাত্রিক। এলএনজি অবকাঠামোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন অবকাঠামোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, সম্ভাব্য চাহিদা, মূল্যঝুঁকি এবং চুক্তির দায়বদ্ধতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। সাশ্রয়ী জ্বালানি ছাড়া শিল্পায়ন টেকসই হবে না; আবার আর্থিকভাবে অদক্ষ জ্বালানি চুক্তি শিল্পায়নের সুফলকে ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।

বিগ-বির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের অবস্থান ভারত, নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কার্যকরভাবে গড়ে উঠলে তা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগ এবং নেপাল-ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর যথেষ্ট নয়। বন্দর থেকে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সীমান্তে পণ্য খালাসের দক্ষতা, গুদামজাতকরণ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যসেবা একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পরিবহন ও ট্রানজিট চুক্তি, অভিন্ন মানদণ্ড এবং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন। এসব সংযোগ দুর্বল থাকলে আধুনিক বন্দর নির্মিত হলেও তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না।

বাংলাদেশের জন্য এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে: আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনের সুযোগ থেকে রাষ্ট্র কীভাবে স্থায়ী আয়, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় ব্যবসার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করবে? শুধু অন্য দেশের পণ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে পরিবহন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। বন্দরসেবা, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, প্যাকেজিং, মেরামত, বিমা, আর্থিক সেবা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে এই যোগাযোগব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ একটি ট্রানজিটপথের পরিবর্তে মূল্য সংযোজনকারী অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে ভূরাজনীতি। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি, জাপানের অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ধারণা এবং ভারতের আঞ্চলিক সংযোগের স্বার্থ বঙ্গোপসাগরকে ক্রমেই কৌশলগত গুরুত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। চীনের অঞ্চল ও পথ উদ্যোগ বা বিআরআইয়ের মাধ্যমে অবকাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি জাপানও উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও সামুদ্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে তার অংশীদারত্ব শক্তিশালী করতে আগ্রহী। এই বৃহত্তর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

কিন্তু কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি মানেই অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হওয়া নয়। বরং ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তা নতুন নির্ভরতা, ঋণঝুঁকি এবং কূটনৈতিক চাপও তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তাই কোনো একটি শক্তির কৌশলগত অগ্রাধিকারের সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জাপান, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। জাপানের প্রযুক্তি, অর্থায়ন, শিল্প ব্যবস্থাপনা এবং মাননিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উৎপাদন খাতকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখাও প্রয়োজন। কৌশলগত ভারসাম্য মানে সব পক্ষকে সমানভাবে সন্তুষ্ট করা নয়; বরং প্রতিটি অংশীদারত্ব থেকে দেশের জন্য সর্বোচ্চ টেকসই সুবিধা অর্জন করা, কোনো একক পক্ষের ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্ভরতা তৈরি না করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখা।

এখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের নিরাপদ নৌচলাচল, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলদস্যুতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা আঞ্চলিক অর্থনীতির স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সহযোগিতা যদি উপকূলরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা, নজরদারি, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটায়, তাহলে তার বাস্তব সুফল পাওয়া সম্ভব। তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তার সহযোগিতাকে কোনো সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন না করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নৌচলাচলের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিগ-বির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপরও। বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার বা ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করেন না; তাঁরা নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির বাস্তবায়ন, করব্যবস্থা, জমি প্রাপ্তি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি, বিচারিক প্রতিকার এবং প্রশাসনিক দক্ষতাও মূল্যায়ন করেন। অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, দুর্বল চুক্তি বাস্তবায়ন এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশ থাকলে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগও বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চুক্তিটির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, শুল্ক ও বাণিজ্যবিধির পরিবর্তনের সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা খাপ খাওয়াতে পারে এবং বাংলাদেশ রপ্তানির পণ্য ও বাজার কতটা বৈচিত্র্যময় করতে পারে, তার ওপর। তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, আইটি সেবা এবং সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান, শ্রমপরিবেশ, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং পণ্যের গুণগত নিশ্চয়তা অর্জন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হবে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। পিপিপি অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও দক্ষতা বাড়াতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি সঠিকভাবে বণ্টিত না হলে ভবিষ্যতের আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই পড়তে পারে। প্রকল্প নির্বাচন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বচ্ছ চুক্তি, স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য সরকারি দায়ের প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের তাড়নায় রাষ্ট্র যেন এমন কোনো চুক্তিতে প্রবেশ না করে, যার ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অথচ অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকে।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই এই সফর একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মসূচির সূচনা হওয়া উচিত। প্রথমত, সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর জন্য সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের সংযোগ নিশ্চিত করতে দক্ষতা উন্নয়ন ও সরবরাহকারী উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি অবকাঠামোর আর্থিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। চতুর্থত, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, রেল-সড়ক যোগাযোগ ও শুল্কব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান, দেশীয় মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয়ের মতো পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলকে বিদেশি বিনিয়োগের ঘোষণার ওপর নির্ভরশীল না রেখে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর দাঁড় করানো। বিনিয়োগকারী পুঁজি নিয়ে আসতে পারেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান সরবরাহ করতে পারেন এবং নতুন বাজারের দরজা খুলে দিতে পারেন; কিন্তু একটি দেশের দক্ষ জনশক্তি, কার্যকর প্রশাসন, সুশাসন, প্রতিযোগিতামূলক শিল্পভিত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নদর্শনের বিকল্প তিনি হতে পারেন না। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য হবে তখনই, যখন বাংলাদেশ এই সম্পর্ককে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে জাপানের বিগ-বি পরিকল্পনার নতুন বিন্যাস বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ উন্মোচন করছে। টয়োটার সম্ভাব্য বিনিয়োগ, জেরার জ্বালানি অবকাঠামো, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভূগোল নতুনভাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা ও অর্জনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করতে হলে প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি, কঠোর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন নীতিনির্ধারণ।

বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্তটি কেবল জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার নয়; বরং সেই সম্পর্ককে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বে রূপান্তর করা যায়, সেটিই আসল প্রশ্ন। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থান বাংলাদেশকে একটি ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে; সেই সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব বাংলাদেশের নিজের।

বিগ-বি যদি শুধু বন্দর, টার্মিনাল ও বিনিয়োগের কয়েকটি বড় প্রকল্পের নাম হয়ে থাকে, তাহলে তার সুফল সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি এটি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, দক্ষ কর্মসংস্থান, প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি, সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক কূটনীতির সমন্বিত কর্মসূচিতে পরিণত হয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য কেবল সমুদ্রপথ থাকবে না—এটি হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রবেশদ্বার।

লেখক: ব্যাংকার ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যানালিস্ট

(ঢাকাটাইমস/২৫ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
রূপগঞ্জে রোগীদের টাকা চুরির চেষ্টার অভিযোগে ৪ নারী কারাদণ্ড
মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে উইনরক
যমুনায় গোসলে নেমে নিখোঁজ হওয়া শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার
বিএনপি যখনই ক্ষমতায় গেছে, তখনই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছে: নাহিদ ইসলাম