আত্মার ভয় থেকে হ্যালোইন উৎসব, জানুন অজানা কাহিনি

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৭
অ- অ+

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর রাত নামলেই শুরু হয় হ্যালোইন উৎসব। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, শপিংমল থেকে শুরু করে পার্টির জায়গা—সবখানেই দেখা যায় ভূত, প্রেত, কঙ্কাল, ডাইনি ও ভ্যাম্পায়ারের সাজ। কেউ মুখে রক্তের দাগ আঁকেন, কেউ পরেন কঙ্কালের পোশাক। আবার কেউ বাড়ির সামনে সাজিয়ে রাখেন কৃত্রিম কবর, ভূতের মূর্তি ও ভয়ংকর মুখ খোদাই করা কুমড়া।

বর্তমানে হ্যালোইন অনেকের কাছে আনন্দ, সাজসজ্জা, পার্টি ও বিনোদনের উৎসব। তবে এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত্যু, আত্মা, পরলোক এবং প্রাচীন লোকবিশ্বাস। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্য থেকে কীভাবে এই উৎসবের সূচনা হলো? কেন মৃতদের আত্মার সঙ্গে হ্যালোইনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?

হ্যালোইনের ইতিহাসের শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর কাছে। ইতিহাসবিদদের মতে, হ্যালোইনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে তাদের ‘সাওইন’ উৎসবের।

প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠী বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে বসবাস করত। তাদের কাছে ১ নভেম্বর ছিল নতুন বছরের শুরু। দিনটি গ্রীষ্মের সমাপ্তি ও শীতের আগমনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ফসল কাটার মৌসুম শেষে শুরু হতো দীর্ঘ ও অন্ধকার শীতকাল।

কেল্টিকদের বিশ্বাস ছিল, ৩১ অক্টোবর রাত অর্থাৎ বছরের শেষ রাতে জীবিত মানুষের জগৎ ও মৃতদের জগতের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে। এ সময় মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত শক্তিও মানুষের জগতে বিচরণ করে বলে তারা মনে করত।

এসব অশুভ শক্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা বড় বড় আগুন জ্বালাতেন। অনেকে পশুর চামড়া ও মুখোশ পরে নিজেদের চেহারা বদলে ফেলতেন, যাতে আত্মারা তাদের চিনতে না পারে। এ সময় খাবার ও পানীয় উৎসর্গ করার রীতিও প্রচলিত ছিল।

পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের ফলে কেল্টিক অঞ্চলে রোমানদের বিভিন্ন উৎসব ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। এরপর ইউরোপে খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন ধর্মীয় আচার।

খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে ১ নভেম্বর পালিত হতে শুরু করে ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সব সন্তের স্মরণ দিবস। এর আগের সন্ধ্যাকে বলা হতো ‘অল হ্যালোজ ইভ’। সময়ের সঙ্গে এই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘হ্যালোইন’ নামে পরিচিতি পায়।

এ ছাড়া ২ নভেম্বর পালিত হয় ‘অল সোলস ডে’। এদিন মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করা হতো। ফলে ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃতদের স্মরণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

হ্যালোইনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হলো ভেতরটা ফাঁপা করে কেটে ভয়ংকর মুখ তৈরি করা কুমড়া। এর নাম ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’ ।

তবে শুরুতে কুমড়া নয়, শালগম, আলু কিংবা অন্যান্য সবজি কেটে তাতে মুখ তৈরি করা হতো। এর পেছনে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের একটি লোককাহিনি।

কথিত আছে, স্টিঞ্জি জ্যাক নামের এক ব্যক্তি শয়তানকে ধোঁকা দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর স্বর্গ কিংবা নরক—কোথাও তাঁর ঠাঁই হয়নি। হাতে জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে তাঁকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে হয়। সেই কাহিনি থেকেই জ্বলন্ত আলোসহ খোদাই করা সবজির নাম হয় জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন।

পরবর্তী সময়ে আইরিশ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে এই ঐতিহ্য নিয়ে যান। সেখানে শালগমের পরিবর্তে বড় আকারের কুমড়া ব্যবহার শুরু হয়। কারণ কুমড়া সহজে কাটা যায় এবং এর ভেতরে আলো রাখাও সুবিধাজনক। ধীরে ধীরে কুমড়া হয়ে ওঠে হ্যালোইনের অন্যতম প্রধান প্রতীক।

হ্যালোইনের আরেকটি জনপ্রিয় আয়োজন হলো ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এদিন শিশুরা ভূত, ডাইনি, সুপারহিরো কিংবা বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায়। দরজায় কড়া নেড়ে মিষ্টি বা চকলেট চায়। মিষ্টি না দিলে মজা করে দুষ্টুমি করার কথা বলে। এ প্রথাই পরিচিত ‘ট্রিক অর ট্রিট’ নামে।

এই রীতির শিকড়ও ইউরোপের পুরোনো ঐতিহ্যে। মধ্যযুগে অল সোলস ডে উপলক্ষে দরিদ্র মানুষেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘সোল কেক’ নামের বিশেষ খাবার চাইতেন। বিনিময়ে বাড়ির মৃত স্বজনদের আত্মার জন্য প্রার্থনা করতেন।

পরবর্তী সময়ে শিশুদের মধ্যেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহের রীতি জনপ্রিয় হয়। আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে ট্রিক অর ট্রিট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় হ্যালোইন সবচেয়ে বেশি জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। বাড়িঘর সাজানো, শিশুদের ট্রিক অর ট্রিট, ভয়ংকর পোশাকের প্রতিযোগিতা, কুমড়া খোদাই এবং বিশেষ পার্টির আয়োজন করা হয়।

আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডেও হ্যালোইনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে আগুন জ্বালানো, মুখোশ পরা, লোকজ খেলা ও বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। যুক্তরাজ্যেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে দিনটি বেশ জনপ্রিয়।

অন্যদিকে, মেক্সিকোতে ১ ও ২ নভেম্বর পালিত হয় ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের স্মরণে উৎসব। এ সময় পরিবারের সদস্যরা প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করেন, কবর সাজান, তাঁদের পছন্দের খাবার রাখেন এবং রঙিন কঙ্কালের সাজে উৎসবে অংশ নেন। তবে ডে অব দ্য ডেড ও হ্যালোইন দুটি আলাদা ঐতিহ্যের উৎসব।

একসময় আত্মার ভয়, মৃত্যু ও অশুভ শক্তির বিশ্বাসকে ঘিরে যে ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটেছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে হ্যালোইন বিনোদন ও বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পোশাক, মুখোশ, কুমড়ার সাজসজ্জা, মিষ্টি, খেলনা ও সিনেমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল বাজার।

তবে হ্যালোইনের ইতিহাসে এখনো জড়িয়ে রয়েছে মৃতদের স্মরণ, আত্মা সম্পর্কে প্রাচীন বিশ্বাস এবং ঋতু পরিবর্তনের ঐতিহ্য। অর্থাৎ আজকের হ্যালোইন কেবল ভূত বা ভয়ংকর সাজের উৎসব নয়; এটি প্রাচীন লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনের ফল।

(ঢাকাটাইমস/৩১ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
বেনাপোলে হয় মাদক ব্যবসায়ী থাকবে, না হয় পুলিশ: ওসি তিতুমীর
এইচএসসিতে দুই বিষয়ে ফেল, শ্রীপুরে কলেজছাত্রের আত্মহত্যা
পূর্বাচলের ৭০০ দোকানে চাঁদার রেট কত, কারা তুলছেন টাকা?
টাঙ্গাইলে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় মামলার ১২ ঘণ্টার মাথায় আসামি গ্রেপ্তার