সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমার দাবি ‘কাল্পনিক’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত এক ভিডিও-অডিও বার্তায় এমন দাবি করা হয়েছে। তবে এ দাবিকে ‘সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করে এর বিপরীতে বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘New York Bangla Life’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনার কথিত ভিডিও ও অডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছে। এতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সেনাবাহিনী নিয়ে বিভ্রান্তিকর এবং অসত্য দাবি করা হয়েছে। বার্তার শেষে ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়ার’ হুমকিও দেওয়া হয়েছে, যা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা এবং সেনাবাহিনীকে উসকানি দেওয়ার অপচেষ্টা।
বিবৃতিতে বলা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির দায় তৎকালীন সরকারের ওপর বর্তায়। সেই সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে এ ধরনের বক্তব্যকে দায় এড়ানোর চেষ্টা এবং জনগণের আবেগকে ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
শেখ হাসিনার কথিত বার্তায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও বিবৃতিতে বলা হয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা বিপর্যয়ের ফল নয়। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও জাতিসংঘের বাজেট সংকটের কারণে ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা মিশন সংকুচিত হচ্ছে।
বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাজেট ১০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে। অর্থায়নকারী দেশগুলোর বকেয়া ও বাজেটসংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মোতায়েনও কমানো হয়েছে। বিভিন্ন মিশনে সদস্যসংখ্যা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
তবে বৈশ্বিক সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়। জাতিসংঘের সামগ্রিক মিশন সংকোচনের অনুপাতে সব দেশেরই সদস্যসংখ্যা কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের হার অন্য দেশের তুলনায় বেশি রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের বাইরেও সাড়ে তিন হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের নিয়মিত শান্তিরক্ষা মিশনের বাইরে বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় ও হাইব্রিড মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন।
এর মধ্যে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে অপারেশন ক্রস রোডস-সংক্রান্ত একটি মিশনে ৫ হাজার ৭৬৮ জন সদস্য রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া হাইতির গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোর্সে (জিএসএফ) ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ সদস্য যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে ২৩০ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল হাইতিতে অবস্থান করছে।
কাতারে বাড়ছে বাংলাদেশি সামরিক সদস্য
বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়। বিশেষ করে কাতারের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের সরকারি নথি অনুযায়ী, কাতারে বাংলাদেশ মিলিটারি কন্টিনজেন্টের (বিএমসি) সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৭ হয়েছে।
এ ছাড়া কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন কাতার কোস্ট অ্যান্ড বর্ডার সিকিউরিটিতে (কিউসিবিএস) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৩৭ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। আগামী ৫ নভেম্বর আরও ২৪ জন সদস্য যোগ দিলে সেখানে বাংলাদেশি সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬১ জনে।
কাতার সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য আরও ৫০০ পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পাঁচ মাসের মধ্যে এসব সদস্যকে কাতারে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৌদি আরবেও নতুন সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সৌদি আরবে দুটি ফ্রিগেট ও একটি এভিয়েশন ইউনিটসহ মোট ১ হাজার নতুন সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচনের মধ্যেও জাতিসংঘের মিশন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার প্রচারণা বাস্তবতাবিবর্জিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
(ঢাকাটাইমস/০৪ নভেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












