ছাত্রদল বিএনপির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিএনপির ইতিহাসের প্রাণশক্তি ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি ও সাতদলীয় জোটের অসংখ্য নেতাকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে দেখেছি। তাদের কেউ উপজেলা চেয়ারম্যান, কেউ এমপি, মন্ত্রী, এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। তৎকালীন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের প্রথম সারির অনেক নেতাকেও জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করতে দেখেছি। অথচ সেই কঠিন সময়ে বিএনপির প্রকৃত প্রাণশক্তি হয়ে টিকে ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
যখন বিএনপির অনেক প্রতিষ্ঠিত নেতা ক্ষমতা ও পদ-পদবির মোহে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন ছাত্রদলের একদল সাহসী তরুণ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। দলের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও তারা পিছপা হননি। বিএনপির যেকোনো সংকটকালে তৎকালীন সিনিয়র নেতাকর্মীদের হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হল ও মধুর ক্যান্টিনে এসে দলের চেয়ারপারসনের খবরাখবর পৌঁছে দেয়া ও নেওয়া এবং ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে সাংগঠনিক যোগাযোগ রক্ষা করতে দেখেছি।
সারাদেশের বহু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির নিজস্ব কার্যালয় না থাকলেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক কার্যালয় ছিল। সেখান থেকেই তারা দাপটের সঙ্গে রাজনীতি পরিচালনা করতেন। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান ও প্রভাব ছিল। স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রার্থীদের ধারাবাহিক বিজয় তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ শত চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সেই বাধভাঙা জোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস তখন কারও ছিল না। মুজিববাদী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ছাত্রসমাজ, ছাত্রশিবির কিংবা বাম-ডান সব রাজনৈতিক শক্তিকেই একই সঙ্গে মোকাবিলা করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির রাজপথের লড়াইয়ে ছাত্রদলই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী অগ্রবর্তী বাহিনী। অনেক কঠিন সময়ে মূল দলের অনুপস্থিতিতেও ছাত্রদলের তরুণ নেতাকর্মীরা বুক চিতিয়ে রাজপথে লড়াই করেছেন।
ইতিহাসের সেই অধ্যায় ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। যে ছাত্রসংগঠন একসময় প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির অস্তিত্ব, সাংগঠনিক শক্তি ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল, সেই ছাত্রদলকে দুর্বল করে দেওয়া মানে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পথকেই সংকুচিত করে দেওয়া।
ছাত্রদলের সেই সময়ের নেতৃত্বের সততা, নিষ্ঠা, মেধা, সাহস এবং দলের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির মূল দলের সিনিয়র নেতাদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মূল দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বস্তরে তাদের এই অবদানের স্বীকৃতিও ছিল।
কিন্তু নব্বই-পরবর্তী সময়ে অযোগ্য নেতৃত্ব, চাটুকার ও স্তাবকদের ক্রমাগত উত্থান এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিস্তারে বিএনপি ধীরে ধীরে তার আদর্শিক অঙ্গীকার ও সাংগঠনিক কমিটমেন্ট থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। জাতীয়তাবাদী শক্তির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছাত্রদল গড়ে তুলেছিল, সেটিও পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ও ধ্বংস করা হয়।
একসময় যে ছাত্রসংগঠনটি ছিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতৃত্ব তৈরির প্রধান কারখানা, সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়তে দেখে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়েছি। আমার বিবেচনায়, এই সাংগঠনিক দুর্বলতার পেছনে দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থ ও ষড়যন্ত্রের ভূমিকাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিএনপি বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেও সেই সাংগঠনিক ট্রমা থেকে দলটি আজও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
একসময় হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হল হয়ে উঠেছিল সারাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ও শেষ ভরসার স্থল। বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়ে হাতে গোনা কয়েকজন সাহসী তরুণ নিজেদের জীবন বাজি রেখে শতভাগ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা, সাহস ও ত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
আজকের বিএনপির নেতৃত্বের কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা: ছাত্রদলের সেই গৌরবময় ইতিহাস, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক অঙ্গীকার থেকে শিক্ষা নিন। চাটুকার ও সুবিধাবাদী নেতৃত্ব নয়, মেধাবী, সৎ, সাহসী, দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্ব তৈরি করুন। কারণ ছাত্রদল শুধু বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠন নয়; এটি ছিল এবং হওয়া উচিত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রধান ভিত্তি।
সবাইকে মনে রাখতে হবে সত্যকে অস্বীকার করা ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির ইতিহাসকে বদলে দেয়ার চেষ্টা বিএনপি রাজনীতির জন্য আত্মহত্যাআর শামিল। নিরু বাবলুর অবদানকে অস্বীকার করা বিএনপি ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মুল স্পিরিটকে অস্বীকার করা। বিএনপি ভালো থাকুক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তার গৌরব ফিরে পাক, বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকুক এটুকুই কামনা।
আলহামদুলিল্লাহ
(ঢাকাটাইমস/০৪ নভেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













