দুদক ক্ষমতাসীনদের বেলায় নমনীয়: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৬ | প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:৫১

দুর্নীতি দমন কমিশন বিরোধীদলের রাজনীতিকদের হয়রানি, ক্ষমতাসীন দল বা জোটের রাজনীতিকদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করছে বলে এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে দুদকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পর মঙ্গলবার ঢাকার মাইডাস সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে টিআইবি।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র তুলে ধরেন টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণা অনুযায়ী স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে দুদককে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং আইনে কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদভাবে বলা হয়েছে। তবে কার্যক্রম ও ক্ষমতার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিরোধীদলের রাজনীতিকদের হয়রানি, ক্ষমতাসীন দল বা জোটের রাজনীতিকদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন; রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আচরণ দেখাতে ব্যর্থ হওয়া; পক্ষপাতপূর্ণ ভূমিকা পালন করার অভিযোগ; বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বেশিরভাগই তদন্ত চলছে বলে সাধারণের মধ্যে ধারণা রয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।’

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী অবস্থান যাদের, তাদের ব্যাপারে দুদক বেশি সক্রিয়। সরকারপক্ষে সেভাবে দুদক সক্রিয় নয়। মাঝেমধ্যে দুদক সরকারি দলের এমপিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকেন। ওই পর্যন্তই। এরপর আর কোনো কিছু দেখা যায় না।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুদকের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।’

দুর্নীতির মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাজার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাও টিআইবির এই বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাটি নিয়ে কোনো কিছু বলা আমাদের এখতিয়ারে নেই।’

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২’ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থপাচার সংক্রান্ত মৌলিক কিছু বিষয় দুদকের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে। ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’Ñ তে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক সম্পর্কিত বিধানটির ফলেও দুদকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি ও সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ক্ষমতা দুদকের নেই। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য দুদক নিজস্ব ধারণাপ্রসূত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

৫০টি নির্দেশকে দুদকের নানা কার্যক্রম বিবেচনায় স্কোরিং করেছে টিআইবি। সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়েছে ‘প্রতিরোধ-শিক্ষা-আউটরিচ কার্যক্রম, স্বাধীনতা ও মর্যাদা পেয়েছে ৬৭ শতাংশ স্কোর, সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক ক্ষেত্র পেয়েছে ৬৭ শতাংশ স্কোর। সর্বনিম্ন ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্র।

দুদকের নানা সমস্যা সমাধানে টিআইবি দিয়েছে নানা সুপারিশ। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগের আগে গণশুনানির আয়োজন করা, দুদকের কাজ তদারকিতে যোগ্যতাসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে স্বাধীন কমিটি গঠন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানের সংখ্যা বাড়ানো, দুদকে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ ও দক্ষ জনবল বাড়ানো।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কোনো কোনো সূচকে দুদকের অগ্রগতি হলেও সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুদক কাগজে কলমে স্বাধীন বটে, কিন্তু বাস্তবে নয়। দুদকের সক্ষমতারও ঘাটতি রয়েছে।’

দুদকের কার্যক্রম মূল্যায়নের এই গবেষণার রেফারেন্স সময় ছিল বিগত তিন বছর (২০১৬-২০১৮) এবং ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গুণবাচক পদ্ধতি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট আইন ও গবেষণা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা; দুদকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, আইনজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ; ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ কর্তৃক প্রাথমিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গবেষণার ফলাফল নিয়ে দুদকের চেয়ার, কমিশনার ও কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ গবেষণায় দুদকের ভাবমূর্তি ও কর্মদক্ষতাকে প্রভাবিত করে এমন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য তথ্য সংগ্রহের মূল্যায়নকাঠামো বা টুল তৈরি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতিকে সাধুবাদ জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটির সুফল দেশবাসী পেতে চায়, কিন্তু এর বাস্তবায়নের এক্তিয়ার যাদের তার মধ্যে অন্যতম দুদক, সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই অকার্যকর করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর মধ্যে একটি ধারা সংযুক্ত করে এক ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে দুদকের আইনগত ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।’

(ঢাকাটাইমস/২৫ফেব্রুয়ারি/জেআর/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :